Monday, February 3, 2020

জমিদারের মেয়ে -- যাকারিয়া আহমদ -- প্রথম পর্ব


sahityalok.com


মরা ফসলে বৃষ্টির জল পড়লে ফসল আর মরা থাকে না। রূপ রঙ বদলে কুমারী হয়ে ওঠে। যুবতীর মতো দিনে দিনে খোলস বদলাতে থাকে ক্ষেত। কার্তিকে গর্ভে সন্তান ধারণ করে অগ্রহায়ণে প্রসব করে ফসল। অগ্রহায়ণ আর পৌষ মিলিয়ে কৃষক এই ফসল ঘরে তোলে আনে। প্রভাতে কুয়াশা ভেঙে ধান কাটতে যাওয়া কৃষকের মুখে তখন শুধু হাসি। সূর্যোদয়ের সময়ে সূর্যের হাসি। ঘরের বৌদিরাও মেতে থাকে নয়া ধানের ঘ্রাণে। অগ্রহায়ণ আর পৌষে সবার ঘরে কিছু না কিছু ধান ওঠে। জমিদারের ঘরে যেমন তেমনি রোজ কামলার ঘরেও।



জমিদারবাড়ির তিনশো বিঘে জমি। 
এই জমির ধান কাটতে বেশ মানুষ লাগে। দুইকুড়ির মতো ছোট বড় কামলা প্রতি বছর কাজ করে। কেউ কাটে। কেউ ভাঙে। আবার কেউ বহন করে আনে ধান। জামিদারবাড়ির বাঙ্গলোঘরে  সবার থাকবার জায়গা। প্রয়োজনবোধে কাজ শেষে কেউ কেউ বাড়িতে গেলেও অধিকন্তু থাকে। নিজেরা পাকসাফ করে খায়।


কয় বছর থেকে আবদুল মালিক জামিদারবাড়ির ধান কাটতে আসে। বয়স বাইশ বা তেইশ হবে। ভালো কাজ জানে। কাজে ফাঁকি দেয় না। সহকর্মীদের সহায়তা করতে তার পছন্দ। তার আচার-আচরণে জামিদার বাবুও খুব খুশি। বাবু অনেক সয়ম তাকে ঘরের কাজেও ব্যাবহার করেন। ওইদিনের মজুরি বাবু নিজের পকেট থেকে দেন। কারণ সে তো অন্য শ্রমিকেরর সঙ্গে কাজে যেতে পারে নি ঘরোয়া কাজের জন্য। আবদুল লজ্জাবতী গাছের মতো মানুষ। 

শরমের শেষ নেই মনে হয় তার। যুবতী মেয়ে যেমন অপরিচিত যুবকের সামনে গা ঢাকবার তাগিদে বারবার আঁচল টানাটানি করে তেমনি আবদুলও। জামিদার বাবুর সামনে গেলে তোষামোদি জন্য নাকি শরমের কারণে আবদুলের ভেঙে পড়বার উপক্রম হয়। কথা স্পষ্ট হয় না। আমতা আমতা করে কথা বলে।


বাবুর পাঁচ ছেলে আর এক মেয়ে। এক ছেলে প্রাইমারির শিক্ষক। আর দুইজন ব্যবসাবাণিজ্য ও পারিবারিক কাজে সবসময় ব্যস্ত। ছোট দুই ছেলে সাইফ ও সিরাজ মাধ্যমিকে পড়ে। আর একমাত্র মেয়ে আদরী প্রাইমারি শেষ করে ঘরে। আদরীকে বেশ আদর লেখা-পড়া করতে দেয়নি। তার জন্য সবার মমতা উতলায়। কোথায় কী হয়। মাথায় রাখলে উকুন খেয়ে বসবে, চোখে রাখলে অশ্রুতে ভেসে যাবে এমন ভাব। একমাত্র মেয়ে তো এজন্য সোহাগ বেশি। আসলে এমন সোহাগ করা ভালো নয় যে সোহাগ লেখা-পড়ার অন্তরায় হয়।

আদরীর বয়স এখন উনিশ বা কুড়ি। চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছে। বাবু সবগুলো প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছেন বয়স কম বলি। কিন্তু আদরীর মানসিক, শারীরিক অনেক পরিবর্তন হচ্ছে দিনদিন। সে মুখ ফোটে কথা বলতে পারছে না। তবু আচার আচরণে বুঝাবার চেষ্টা করছে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য। জমিদার বাবু বিষয়টিও বুঝেও না বুঝার ভান করে চলছেন। 


বাবুর খেয়াল__এক মেয়ে, একে কার হাতে দেবেন, কে কতটা আদর-সোহাগ করে রাখবে। নিজের এতো এতো সম্পত্তি, জমি-জামা এগুলো কে খাবে। বাড়ির যে কোনো পার্শ্বে ঘর করে দিয়ে পছন্দের একটা ছেলে নিয়ে আসবে। কিন্তু ভালো কোনো ছেলে পাওয়া যাচ্ছে না। যাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে এরা আদরীর সঙ্গি হিসেবে বে-মানান।
এইবারও আবদুল ধান কাটতে এসেছে। কিন্তু জমিদার বাবু থেকে অনেক দূরে দূরে হাটছে। খুব ব্যস্থ সে। সারাদিন ধান কাটা। রাতে পাখি শিকার। সকালবেলা কাজে যাওয়ার আগপর্যন্ত ঘুম। এই দূরে হাটার পেছনে কারণ কী আবদুল ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। আবদুল হয়তো বাবুর ধ্যান ধারণা আঁচ করতে পেরেছে। জামিদার বাড়ির মেয়ে। তার চাহিদা থাকবে যা আবদুল পুরণ করতে পারবে না।


 মাছ ভাত আর নানারকম পোশাকে আবৃত 'আদরী'কে নিয়ে সে সন্তুষ্ট করে রাখতে পারবে না, এই বিশ্বাস থেকেই আবদুল দূরে দূরে হাটছে হয়তো। এসব শুধু ভাবনা। কারণ বাবু তো আর তাকে প্রস্তাব করেন নি যে তুমি আমার মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে।
পৌষ মাস শেষ হতে আর মাত্র দুই দিন। ধান কাটা শেষ। এখনও কিছু ধান ভাঙার বাকি রয়েছে। এইটুকু শেষ হলে সব কামলা চলে যাবে। তার সঙ্গে আবদুলও তো চলে যাবে। জমিদার বাবুর খুব খেয়াল আবদুলের সঙ্গে তাঁর 'আদরী'কে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে আবদুলকে রাখবেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসলেন পরামর্শ করবার জন্য। 


সবাই এতে একমত। সবার একই কথা "ঠিক আছে আবদুল যদি রাজি হয় তাহলে আমাদের কোনো অসুবিধে নেই।" এখানে দু'টি বিষয়কে সামনে রেখে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেসে। "এক. আবদুল মালিকের মতো একটা ছেলে দশগেরাম খোঁজেও পাওয়া যাবে না। যেমন তার চলাফেরা তেমন তার কথা-বার্তা। 




এতো বছরেও আবদুলকে কারও সঙ্গে ঝগড়া-ফাসাদ করতে দেখা যায় নি। বরং তার সহকর্মীরা তার প্রশংসাই করেছে। দ্বিতীয়ত. আমাদের 'আদরী' তো আমাদের বাড়িতেই থাকছে। সবসময় কাছে পাওয়া যাবে।" এইসব কথা বাবুর বড় ছেলে মাস্টার মশাই বললেন। ছোটরা শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কিন্তু আবদুলের কাছে বিয়ের প্রস্তাবটা কে দেবেন এটা সিদ্ধান্ত করতে রাত দশটা বেজে গেল। কারণ__আদরী জমিদার বাবুর একমাত্র মেয়ে। ছয় ভাইয়ের একমাত্র বোন। আর সাধারণ এক কামলার কাছে তুলে দেবেন, দেশের মানুষ কী ভাববে। কোন চোখে দেখবে বিষয়টাকে। এইটুকু ভাবতে ভাবতে এতো রাত। 

এদিকে 'আদরী' খুব আনন্দে। মরা জীবনে কে যেন জল ঢেলে প্রাণে বাঁচাতে যাচ্ছে। চৈত্রমাসের পোড়া রোদে ফেটে যাওয়া জমিতে যেন বৃষ্টি হতে যাচ্ছে। মেয়েদের বয়স যখন আটার থেকে কুড়ি হয় তখন তাদের মনে একটাই প্রশ্ন দাগ কাটে যে কেউ আমার জন্য তৈরি হচ্ছে না কেন? যখন কেউ তৈরি হয় তখন তারা মনে করে তৃষ্ণার্তের হাতে না চাইতে যেন জল।

বাবুর দ্বিতীয় ছেলে রাব্বী রাজি হলেন এই প্রস্তাবটা তিনি দেবেন আবদুলের কাছে। অতঃপর সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে গেলেন। পরেরদিন সকালে আবদুল কাজে লাগবার আগেই রব্বানী তাকে ডাকলেন। আবদুল তার ডাকে সাড়া দিল। কারণ রাব্বী এতো ভোরে তাকে আর কোনোদিন ডাকেন নি। 


"তোমরা তো আগামী কাল চলে যাচ্ছ। ঠিক আছে যাও, সময় পেলে ঘোরতে আসবে কিন্তু" আবদুলকে বললেন রাব্বী। "ঠিক আছে আসব, কাজের মানুষ তো, মানুষের কাজে গেলে সময় পাওয়া যায় না। তবু সময় পেলে আসব" আবদুল বলল।
রাব্বী: আচ্ছা আবদুল তোমাকে একটা কথা বলি, পছন্দ হলে রাখবে না হলে নেই।
আবদুল: ঠিক আছে বলুন।


রাব্বী: আমাদের পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে তোমার সঙ্গে 'আদরী'কে বিয়ে দেব। এতে তোমার মতামত কী? তোমার কোনো খরচ করতে হবে না। 
আবদুল: ভালো কথা। আপনাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। আমারও তো একটা পারিবারিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। কী মনে করেন আপনি?


রাব্বী: হ্যাঁ। ঠিক আছে আগামী কাল বাড়িতে যাও। তোমার আব্বা আম্মার কাছে আমার স্যালাম বলিও এবং এ বিষয়টিও বলিও। তারা সম্মতি জানালে আমাকে অবগত করবে কিন্তু।
আবদুল: ঠিক আছে ভাইজান।

রাব্বীর কথা শোনে প্রেমহীন আবদুলের মনে নতুন করে যেমন প্রেম জাগল তেমনি আবদুলের মনে অযাচিত অনেক প্রশ্নেও জন্ম নিল। আজকে আর আগের মতো আবুলের  ধান ভাঙতে পছন্দ হচ্ছে। সঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না। ক্লান্তির ফাঁকে হাসন রাজার গান আসছে না। সহকর্মীরা বারবার জিজ্ঞেস করে আবদুল তোর আজ কী হয়েছে? 



আবদুল তাদের কোনো উত্তর দিতে পারে না। সে ভাবনার জগতে ঘুরতে ঘুরতে ফিরে আসে তার অসহায়ত্বের কাছে। একদিকে নিজে দিনমজুরের ছেলে অপর দিকে আদরী জমিদারের মেয়ে। ধনীর দুলালীদের অনেক বায়না থাকে। যা পুরণ না করতে পারলে ঘর ভাঙে। ওদের কাছে চাওয়া পাওয়া-ই বড়। স্বামীর অসহায়ত্বের দিকে তাদের চোখ যায় না। 
কাজ শেষে সব কামলা জামিদার বাড়ি এলেও আবদুল এল না। সে তার নিজ বাসস্থানে চলে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন সাথীরা আবদুলকে না পেয়ে কামাইকৃত ধানগুলো ভাগ করে নিল।  আবদুলের ভাগের ধান পৃথক করে রাখল। 
পৌষে ঘন কুয়াশা নামছে। সন্ধ্যা সন্নিকটে। সবার ধান গাড়িতে উঠানো প্রায় শেষ। এমন সময় আবদুলের ছোট ভাই মফিজ জমিদার বাড়ির উঠোনে হাজির। মফিজকে কামলারা চিনে। গত বছর কাজের সময় কয়দিন আবদুল অসুস্থ ছিল। তখন মফিজ তাদের সঙ্গে কাজ করেছে ভাইয়ের পরিবর্তে।
মফিজ আসার খবর জামিদারবাড়ির ভেতরে কীভাবে পৌঁছেগেছে। কেউ জানে না! বাবুর ছেলে হারু এসে তাকে নিয়েগেল ভেতরে। অনেক সম্মান করল বাড়ির মানুষ। সায়সম্মান দেখে মফিজের মনে অনেক প্রশ্ন জাগল। তবু না চাইতে জল ভেবে গ্রহণ করল তাদের অতিথিয়তা। কুশল বিনীময়ের ভেতরে জমিদার বাবু মফিজকে বললেন "তোমার ভাইকে আমার মেয়ের জামাই করার খুবই ইচ্ছা। জানি না তোমার আব্বা আম্মা মানবেন কী না? আবদুল মালিক আমার পছন্দের একটা ছেলে"। ফাঁকে আদরীও এসে মফিজকে সালাম করে গেল।



ঘনকুয়াশায় অন্ধকার হতে যাচ্ছে রাত। তাই মফিজ বসতে পারছে না। বিদায় চাচ্ছে বারবার। জমিদার বাবু না খাইয়ে তাকে বিদায় দিচ্ছেন না। ওদিকে অন্যান্য কামলা নিজ নিজ মাল-সামান নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মফিজকেও ডাকছে এক সঙ্গে চলে যাবার জন্য। জমিদার বাড়ির মসজিদে এশার আযান মফিজ আর বসতে পারল না। উঠে দাঁড়াল। সবার কাছে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ধানের কাছে এসে দেখে কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। নিকটতম বাজার থেকে একটি মিনি ট্রাক বাড়ায় এনে ড্রাইবারকে নিয়ে ধানের বস্তাগুলো ওঠাল। মালামাল ওঠাতে ওঠাতে রাত অনেক হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে বাড়ির পথে গাড়ি ছাড়ল।

চলবে