Saturday, February 1, 2020

ঝড় -- পর্ব - ২৪ - বন্য মাধব

sahityalok.com




কেষ্টার কাজ কারবারের হিসেব নেবার মতো আমাদের বুদ্ধি তো ছিলই না, এমনকি আগাম অনুমান করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না, বয়সে একটু ছোট হলে কি হবে, ও আমাদের এ হাটে কিনে ও হাটে বেচে দিতে পারে, সেই কেষ্টা একবার আমার দ্বারস্থ হলো, সেদিন তার চোখমুখের হাল দেখে সত্যি ভয় ভয় করছিল, একটা কাজ ওর হয়ে আমাকে করে দিতে হবে, কি? না, খাম বন্ধ একটা, যদিও মনে হল একটা নয়, চিঠির তাড়া, ওর ইয়ের হাতে দিয়ে আসতে হবে, আগে শুনেছিলাম একটু একটু, কিন্তু যতদূর জানতাম মেয়েটা কেষ্টাকে খুব একটা পাত্তা দেয় না, বললাম, যদি না নেয়, যদি বড়দের ডাকে, ছোট বড় কথা বলে, তখন কি করবো?


 
 
একটু আমার হয়ে বোঝাস না, তুই বললে ও বুঝবে ঠিক, আমি আর পারছি না রে, কেষ্টার কাতরানি চোখে পড়ে, বললাম, আচ্ছা যাব, তাও বলি, যে বোঝে না তাকে বুঝিয়ে কি লাভ, ও কোনো কথা শুনতে রাজি নয়, অগত্যা সব কাজ ফেলে মেয়েটার বাড়ি গেলাম, প্রথমবার দেখা পেলাম না, পরেরবার গিয়ে পাকড়ালাম, বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলল, বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেল না, উদ্দেশ্য বললাম, চিঠিটা বার করলাম, ওর নাকমুখ কুঁচকে গেল, একরাশ বিরক্তি নিয়ে কেটে কেটে জবাব দিল, ছিঁড়ে ফ্যালো ওমন চিঠি, যেন কেষ্টা নয় আমিই প্রেমপত্রটা দিচ্ছি, বলল, ওকে বহুবার বলেছি আমি রাজি না, নিজে পারছে না তাই একে পাঠাচ্ছে ওকে পাঠাচ্ছে,
 
 
 
 
বাড়ির অমতে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়, তা ঠিক, তা ঠিক, মনে মনে বললাম, মনে হল কেষ্টা মরতে এই পাথর মেয়েকে কেন যে ভালবাসতে গেলো বলি এবং চিৎকার করেই বলি, সেটা না করে বরং নরম করে বললাম, দ্যাখো বোন, ও তো খুব ভেঙে পড়েছে, তুমি অন্ততঃ বন্ধু হিসাবে ওর চিঠিটা নাও, আর যা মনে হয়, কিছু একটা লিখো, তুমি ওকে দিতে না পারলে আমাকেই দিও, আমি ওকে দিয়ে দেবো, আর তুমি যে ওকে ভালবাসতে পারছো না, বাড়ি মানবে তাই,
 
 
সেটাও ওকে আমি তোমার হয়ে বোঝাবো, তবে ও ঠিক এই মুহূর্তে কোন কিছু বোঝার অবস্থায় নেই, ভয় পাচ্ছি কিছু করে না বসে, একটা ভালো বন্ধুকে আমরা হারাবো, সারা জীবনের ক্ষতি, মেয়েটি একটু যেন চমকে গেলো, তবে কিছু আর বললো না, হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল, যাক একটা কাজ হলো, এবার কেষ্টাকে সামলানোর কিছুটা সময় পাওয়া যাবে, মিকিদিকে জানিয়ে বুদ্ধি ধার নেবো।
 
 
কেষ্টা কি সব খুলে বলা উচিত, উঁহু, যদি কিছু করে বসে, বরং সবটা নয়, কিছু কথা বলবো, চিঠিটা পৌঁছে দেওয়াটাও একটা সাফল্য, সে কথাটাই বলবো বলেই ঠিক করে নিলাম, হাজার হোক কেষ্টার কোনো ক্ষতি তো আমি হতে দিতে পারি না, আবার মিথ্যে আশ্বাসও দেওয়া ঠিক হবে না, বরং কেষ্টাকে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে বলতে হবে, বোঝাতে হবে,
 
 
 
তার মতো ছেলেকে যে ভালবাসতে পারে না সে মেয়েই হতে পারে না, মেয়ে হলে কেউ এমন ভালবাসাকে হেলা করতে পারে! এটা ওটা ভাবতে ভাবতে আনমনে আসছি, কেষ্টাই থামালো, তা ভালোই হল, ঘেমে গেছি, সাইকেল থেকে নামলাম, দু'জনে একটা গাছের ছায়ায় বসলাম, কেষ্টা বললো, দে ওটা ছিঁড়ে ফেলি, জানতাম ও নেবে না, দে, দে ,  ছিঁড়ে ফেলি, জানতাম.....
 
 
বললাম, কি জানতিস, সেটা বড় কথা নয়, যেটা হল সেটাই বড় কথা, তোর ও চিঠিটা নিয়েছে, অপেক্ষা করিস, উত্তর পেয়ে যাবি, কেষ্টা অবাক, ফ্যাল ফ্যাল করে মুখের দিকে চেয়ে আছে, শুধু বললো, তাই! কি বললো আর? কি আর বলবে, নিজের কাজ করতে বললো মন দিয়ে, উত্তরও দেবে! একটু হাসলো কেষ্টা, অবিশ্বাসের হাসি, শুধু বললো, তাই! তা কবে দেবে? তা বলে নি, আমি নরম হয়ে বলি, মনে হল তাড়াতাড়িই দেবে, একটু ধৈর্য্য ধর না, হুম, বলে কেষ্টা খানিকক্ষণ চুপ মেরে গেলো, কী যেন আকাশ পাতাল ভাবছে, বললাম, আমার একটা কাজ আছে রে আসি, উঠে পড়লাম, ও কিন্তু বসেই থাকলো।
 
 
মিকিদির কথা বারবার মনে পড়তে লাগলো, মিকিদি শুনলে নির্ঘাৎ বলতো, প্রেম কি একপক্ষের হলে হয়? ক'দিন চলবে একা একা জাল বোনা, মনের জ্বলন কি করে একা একা জুড়াবে? পাখিরাও চায় ঠোঁটের উষ্ঞতা, মানুষ কোন ছার! বলেই হয়তো মিকিদি বিশেষ কায়দায় ঠোঁট ছোঁয়াবেই, আর সময় সুযোগ থাকলে মিকিদিকে স্বয়ং প্রকৃতিও থামাতে পারে না, মিকিদির এতো তেজ, এত বিস্ফোরণ, এত আকুলিবাকুলি জড়িয়ে থাকা!
 
 
পরেরদিনও জবাব এলো না, তারপরের দিনও, কেষ্টাকেও কেউ কোত্থাও দেখছি না, তারপরের দিন খেলার শেষের মুখে উসকোখুসকো কেষ্টা এলো, খেলা ফেলে দৌড়ে এলাম, কী ব্যাপার রে কেষ্টা!
কিছু না, কিছু না, তোরা খ্যাল, কিছু না বললে হল? আমরা নাছোড়, সবাই কেষ্টাকে নিয়ে পড়লাম, আর ওদিকে কেষ্টা নিরাসক্ত ফকির ফকির মূর্তি ধরেছে, সন্ধ্যে হবো হবো, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করল, চুপচাপ একটা শেষ হলে আরেকটা টানতে লাগলো, লাল লাল চোখ, আমরা অবাক হয়ে কেষ্টাকে দেখছি, শেষ সিগারেটটা ধরাবার পর পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল, তাতে ইয়া বড়া করে লেখা - না,
 
 
 
আর কিছু নেই, কেউ বুঝুক না বুঝুক আমি তো বুঝলাম, কিছু বলার আগেই কেষ্টা সেটায় আগুন লাগিয়ে দিল, প্রত্যাখান পুড়তে লাগলো, আমি, আমরা কেষ্টার কষ্টটা বোঝার বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম, এ যেন সেই ভাবসম্প্রসারনটা - কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে, কভু আশিবিষে দংশিনী যারে, ঠিক, হাজার চেষ্টা করলেও ওর মনের অবস্থা বোঝা আমাদের কম্ম নয়, একে একে সবাই চলে গেল, কেষ্টা বললো, উদাস উদাস গলা, ছোট্ট করে, সব শেষ! বললাম, কে দিয়ে গেল? কেষ্টা কিচ্ছুটি বললো না, শুধু একটু হাসলো, তখনও জানতাম এ হাসির মানে কী! জানলাম, পরেরদিন সন্ধ্যায়, কেষ্টাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কী হলো, কোথায় গেলো, কোথায় যেতে পারে - এসব আগডুম বাগডুম ভাবতে লাগলাম।
 
 
পাঁচদিনের মাথায় ওর বাড়ির লোকেরা আমার কাছে এলো, আমি কী বলবো, ওসব বলা যায়! বললাম, কেষ্টা তো আমাকে কিছুই বলে নি, মেয়েটার কথা ওরা কিভাবে যেন পেয়েছে, আমি বললাম, ওসব কিছু আমি না, আমার সঙ্গে ওর কোনো কথাই হয় নি এ বিষয়ে, ওরা বিশ্বাসই করলো না আমার কথা, আমি কি করবো, আমার কিছুই করার নেই, শুধু কেষ্টার জন্যে কষ্ট হতে লাগল, কোথায় মিলিয়ে গেলো রে বাবা!
 
 
ঠিক কুড়ি দিনের মাথায় কেষ্টা একা একাই বাড়ি ফিরলো, সারা পাড়া ওদের বাড়ি ভেঙে পড়ল, শুধু আমি গেলাম না, অপেক্ষা করতে লাগলাম ও কবে আমার কাছে আসে, বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না, একদিন পরই সন্ধ্যের সময় এলো, ওর মধ্যে আগের সেই অস্থিরতা আর নেই, দুঃখবোধও নেই, পকেট থেকে একটা মোটা খাম বের করলো, বললো, তুই আমাকে সত্যিই ভালবাসিস, কুড়িদিনের দিনলিপি তাই তোকেই দিলাম, পড়িস, হুম, তাতো পড়তেই হবে, কৌতূহল আর উত্তেজনা বাড়তেই লাগলো, শান্ত হয়ে বললাম, পড়বো রে।


 
 চলবে