Saturday, February 8, 2020

ঝড় -- পর্ব - ২৫ --বন্য মাধব

sahityalok.com


কেষ্টার ডাইরিতে চোখ রাখি, সাধারন একটা ডাইরি, ঐ যেমন হয় আর কি! প্রথম খান দশেক পাতা শুধু আঁকিবুকি কাটা, পরের পাতা থেকে শুরু, কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই ........




দিন - ১



ক'দিন থেকে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল, হায়, এতো অস্থির অস্থির লাগছে কি বলবো, কারও সঙ্গে মিশতে ভালো লাগছে না, শুধু মনে হচ্ছে, এমন কোথাও চলে যাই, যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, দেখেও নি, নতুন করে জীবনটা শুরু করবো, ভালবাসার জন্যে এমন আয়ুপাতলা হবো না, কি হবে এসব করে? এমন কোনো দেশে যাব, যেখানে যা মন চাইবে তেমন কাজই পাবো, পাখিদের মত মুক্ত, স্বাধীন জীবন!




হায়, কি ভালবাসার জোর! একটা ছেলে দিনের পর দিন ভালবেসে ভিখিরি হল, আমার কি কম ছিল? এতো অবহেলা, এতো ঘেন্নাপিত্তি, এতো চুপচাপ কেউ থাকতে পারে! আমার কেন এতো ভিখিরি স্বভাব, ডাঁট নেই জীবনে, হায়, নাও, নাও, পৃথিবীশুদ্দু নাও, এককোণে পড়ে থাকি আমি, অন্ধকারে, আরো অন্ধকারে, টলতে টলতে গিয়ে পড়ি, ভালবাসা এমন, এমনই? কেউ দাম না চুকিয়ে পায়, আর কেউ কেউ ভাগ্য করে জন্মায়, ভালবাসার সঙ্গে উল্টে দামও পায়, সে পাওয়ার শেষশুরু নেই, আর যারা না পেল, চেয়ে চেয়ে ভিখিরি হল, তারা?  তারা কি করে? মাল খায়, জগৎ দেখতে বেরোয়, অন্ধকারে থেকে ভাবে এই বেশ আছি? নাকি ঐ মেয়েটার মত, রোজ হাজারটা রাস্তার কুকুর, বেড়াল, বুনো পাখিদের পেট পুরে খাওয়ায়, আর মনের ব্যথা শেয়ার করে? আমি কি করবো? হায়, আমি কি করবো, আমি!


রাতদিন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমার ব্যর্থতা, কত স্মৃতি, মায়াচোখে কত রহস্যালাপ, হালকা ছোঁয়া, চিরকূট পেয়ে কোটি টাকার লটারি জেতার লাফানি, রাতগুলো কত দীর্ঘ, দীর্ঘ দীর্ঘ মনে হতো, আর এখন! অন্ধের কিবা রাত কিবা দিন! এ জগৎ সব তোমার, আমি চলে যাব, আর ফিরবো না, এতো বড় পৃথিবী! কোথাও না কোথাও ঠাঁই মিলবে, মিলবে না! এত বদ নসিব! হায়, হায়, হায়!



এখন ক'টা বাজে? দেওয়ালের দিকে তাকাই, রাত দেড়টা, কে যেন ডাকছে, আয়, আয়, আয় চলে, আয়! ঘরের সব গেটে তালা, সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠি, চারদিকে কি অন্ধকার, ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো, কি ভাবছিস এতো, আয়, আয়, আমার অন্ধকারে তোকে মুড়ে ফেলি, কেউ তোকে দেখতে পাবে না, আমি তো তোর আপন, সবচেয়ে আপন, সবাই তোকে ছেড়ে গেলেও আমি তোকে ছাড়ি নি, আমি তো তা পারি না, বল পারি? আয়, আয়, আমিই তোকে পথ দেখাচ্ছি, রেলিং ডিঙা, আস্তে, কার্ণিশে পা রাখ, বাঃ, গুড বয়! এবার ছোট্ট করে একটা লাফ কাট, নারে কিচ্ছু হবে না, বড়জোর কিছু একটা পড়ার ঝুপ করে একটা শব্দ, কারও কানে ঢুকবে না, মাঝ রাতের ঘুমে সবাই আচ্ছন্ন, না, না আমাকে ছলনার কিছু করতে হবে না, মার, মার, মার লাফ, হুম, এই তো চাই, লাগলো? হুঁ, হুঁ বাপ, আমি আছি না!



আয়, আয় এবার এদিক দিয়ে, অনেক সময় আছে, আয় দিখিনি, হুম, কিচ্ছু ভয় নেই, দূর, দূর, ওসব রটনা, এই শিরীষের ডালে কেউ নেই রে, কেউ থাকেও না, ঐ যে অশথ আর বট, জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে, ওরা আলোকে কলা দেখায়, ওটা আমার সিদ্ধপীঠ, পেন্নাম কর বাপ, বড় মায়া রে ওদের, যার কেউ নেই, যার সব থেকেও কেউ থাকে না, ওরা তাদের পরম আদরে কোলে টানে, লালন পালন করে, ধীর শান্ত পৃথিবীর রহস্য বোঝায়, এগিয়ে চল বাপ, ঐ যে সারি সারি তালগাছ, শিরশির করে বয়ে চলা হাওয়া ওদের মাথায় আটকায়, এমন খড়খড় আওয়াজ তোলে, মানুষ ভয় খায়, বদনাম করে, ওসব কিছু না, জগতে যে যার কাজ করে চলেছে, আয় ছপছপ করে বাপ, আরে এতো ডরপুক হলে চলে! ও হো, ওটা তো শকুন ছানার কান্না, ধ্যুর, কি যে ভাবিস পাগলা!



তোরই বা দোষ কি? জন্ম থেকেই তো এসব শিখছিস, এই যে বাঁধন ছেড়ে বের হলি, এবার নিজেই বুঝবি, কি বুঝবি জানিস? জানিস না! আমার মধ্যেই আলোর বাস রে পাগল, আলোকে পেতে গেলে আগে আমার মধ্যে মিশে যা বাপধন!



দরদর করে ঘামছি, চুল খাড়া, লোম খাড়া, মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটছিই তো হাঁটছি, যে পথে হাঁটছি, চেনা যাচ্ছে না কিছুই, বাস রাস্তা ধরে কতটা হেঁটেছি? আন্দাজও পাচ্ছি না, একটা তিনমাথার কাছে এলাম, হ্যাঁচকা টানে পা চলে এলো সাইড রাস্তায়, হুম, ঠিক ঠিক, মনখুশি হাঁটো এবার, আকাশ কি এবার পাতলা হতে শুরু করলো? আগের মতো আর গাঢ় নেই, দূরের গাছগাছালি আবছা আবছা নজরে পড়ছে, এবার পাখিরা জেগে উঠবে, মোরগ ডেকে উঠবে কাছে দূরে, আস্তে আস্তে ভয় কাটছে, অশরীর জনজীবন মিলিয়ে যাবে এবার, মন থেকে, শরীর থেকে আর চোখ থেকে, জাগবে শরীর জীবন, জীবনে জীবন মিশে মিশে যাবে, আনন্দে দুঃখে।


আরো বেশ কিছুটা পথ যাবার পর হুড়মুড়িয়ে ভোর আসবে, চেনা পরিচিত পাখিদের ডাকাডাকি, ওড়াউড়ি, গাছের কোটর থেকে ডাকছে তক্ষকও, একটা খাল বরাবর হেঁটে চলেছি, পাড়ের গা লাগানো ঘরবাড়ি, গোয়াল, এগোচ্ছি, হঠাৎ একটা আওয়াজে থমকে দাঁড়ালাম, পাশের গোয়াল থেকে মনে হল আওয়াজটা এল, কিসের আওয়াজ বোঝবার চেষ্টা করতে লাগলাম, বাঁশের বাতা ঘেরা গোয়ালটা, মাঝে মাঝে তালপাতা বাঁধা, যেমন হয় আর কি, আবছা অন্ধকারে গোয়ালঘরে কিসের একটা আওয়াজ হচ্ছে, গরুচোর নাকি? আমার অস্তিত্ব এখনও বুঝতে পারে নি ও বা ওরা, মনে হয়, নাহলে আওয়াজ বন্ধ হয়ে যেত, যা পারে হোগ্গে আমার কি! কিন্তু পা চালাতে গিয়েও আটকে গেলাম, হায়!!!




উদোম একটা ছেলে, রাখালই হবে হয়তো, একটা গরুর গায়ে লেপ্টে...... মুখ থেকে বেরিয়ে এল জানোয়ার কোথাকার........ থমকে গেল সে, নিমেষে অন্ধকারে মিশে গেল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সব, কিসে সুখ মানুষের? ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো, যার কাজ সে করছে, চল মন নিজ নিকেতন, হাঁটো আরও জোরে, আলো ফোটার আগেই চেনা পরিবেশের বাইরে পা রাখো, চালাও পা, চালাও পা....... এ জগৎ তোমার না, খোঁজো, খোঁজো, নিজেই নিজের জগৎ খুঁজে নাও.............





দিন - ২


একটা কোকিল ডেকে উঠল, কয়েকটা কাকও, এবং মোরগও, হালকা হতে লাগলো আকাশ, কাঠের সেতু দিয়ে খাল পেরিয়ে এখন যেখানটা এসে দাঁড়ালাম, সেই গ্রামের নাম শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল, ডাকাতপুর! এ যেন বইয়ে পড়া রঘু ডাকাতদের কোনো গ্রাম, যে ছেলেটি যেচে এসে আলাপ করল, তাকে বা অন্যদেরও দেখে ডাকাত ডাকাত মনে হলো না, ছেলেটি নিয়ে গেল ওদের বাড়ি, কথা বলতে খুব ভালবাসে, শুধু ও নয়, বাড়ির সকলেও খুব মিশুকে, গোটা গ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা হলো, কিন্তু নিজের সম্পর্কে কাউকে কিছু বলতে পারলাম না, কি বলবোই বা? ছেড়ে আসা বাড়িকে আমি ভুলতেই চাই, নতুন জন্ম হোক আমার, নতুন জন্ম, এ পৃথিবীর কোনো একধারে, সবার দৃষ্টির বাইরে, জীবনের সব আগ্রহের বাইরে, একা প্রকৃতির কোলে।


ছেলেটির সঙ্গে গোটা গ্রামটা চষে ফেললাম, ওদের লাঠি খেলা, চোরা খেলার আখড়ায় গেলাম, সব ছন্দ, সব ইতিবাচকতা নিরর্থক মনে হল, ওদের খালপাড়ের শ্মশানে গেলাম, নির্জনতা গ্রাস করলো, কালীপুজো উপলক্ষে যাত্রাপালা - মানত এর মহড়া দেখলাম, কিন্তু মনের জ্বালা মিটছে কই? বরং আরও বাড়ছে, বেড়েই চলেছে, বাড়ি ফিরে আরেক অস্বস্তিতে পড়লাম, খোঁজ পেয়ে প্রতিবেশীরা দেখতে এসেছে, নানা জনের নানা মন্তব্য, কেউ বলছে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, কেউ বলছে, বলা তো যায় না কার মনে কি আছে, একজন আবার ঘর পোড়া গরু, তার বাড়িতে আবার এমন এক ভেসে আসা ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল, কয়েক মাস পর সে পাখি ফুড়ুৎ, একজন তো ফটাফট আমাকে ট্র্যানশ্লেসন জিজ্ঞাসা করেই চলেছে, একজন একটা ক্লাস টেনের টেস্ট পেপার নিয়ে এসে হাজির, অঙ্ক করতে বলা হল, করা হয়ে গেলে একজন এবার তার শালীর মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধই করতে চাইল, তার বিশ্বাস, আমি বাড়ি পালানো, বড় ঘরের! মন খোঁজো নিজ নিকেতন........



দিন - ৩


পরদিন ভোর ভোর উঠলাম, ছেলেটিকে ডেকেও তুললাম, বললাম, ভাই আমার জন্যে তোমাকে আর কষ্ট দিতে মন চাচ্ছে না, চললাম, ছেলেটি অবাক হয়ে গেল, বলল, কাউকে কিছু বলবে না! মাথা নাড়লাম, বললাম কিছু ভালো লাগছে না ভাই, আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না..., জানতে চাইল, কোথায় যাবে কিছু ঠিক করলে? বললাম, না, চলো, তাহলে এগিয়ে দিয়ে আসি, ছেলেটি অনেকটা দূর এগিয়ে দিল, হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি, মাটির রাস্তা,



 একটা দীঘি দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম, কাঁচের মতো জল, দু'আঁচলা খেলাম, কয়েকটা লাল সুতি শাপলা তুলেও খেলাম, বেশ খেতে, অচেনা মুখ দেখে কয়েকজন পথ চলতি আশপাশের লোক এটা ওটা জানতে চাইল, বললাম, আমি নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, একজন অবাক হয়ে বললো, কিন্তু তোমার খামখেয়ালিপনা বাড়ির লোক মেনে নিয়েছে? বললাম, ওরা আমাকে খরচের খাতায় রাখে তো, আলাপ জমে ওঠার আগেই একজন বললো, আমার বাড়ি যাবে, দু'বেলা আমার তিনটে বাচ্চাকে পড়াবে? কিছু্ক্ষণ ভাবলাম, বললাম, আচ্ছা, চলুন, লোকটা বেশ খুশি হল,


বেশ কিছুটা হেঁটে তার বাড়ি, বড়টা ক্লাস থ্রি, পরেরটা ওয়ান, শেষেরটা শিশু শ্রেণি, বাবার ঘোষনায় সবাই খুশি মনে হল, মা-টিও, বড়টি সহজে আমার সঙ্গে খাপ খেয়ে গেল, চানের পুকুরে নিয়ে গেল, কৌতূহলীদের নানান প্রশ্নের যুৎসই সব উত্তর যোগাতে লাগলো, করিৎকর্মা ছেলে, দুপুরটা ওর হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে কেটে গেল, বিকালে কিছু কৌতূহলী লোকজন এল, মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠান চললো, সন্ধ্যেয় পড়াতে গিয়ে বুঝলাম, ও বাবা, কত কঠিন কাজ এই পড়ানো, কত ধৈর্য্যের কাজও! রাতে ঘুমাতে যাবার সময় বড়টির কাছ থেকে দু'টো অযাচিত ইনফর্মেশন মিলল, ঠিক সামনের বাড়ির মেয়েটি, সম্পর্কে ওর পিসি, নাকি ডেঞ্জারাস, আর বাবা প্রায়ই গ্লাস টানে! হুম, মন খোঁজ নিজ নিকেতন.....






 চলবে     ---------