Saturday, January 25, 2020

বার্মুদা রহস্য --শেষ পর্ব - সিদ্ধার্থ সিংহ

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি - ক্লিক করুন 






সাহিত্যলোক

বার্মুদা রহস্য --শেষ   পর্ব -  সিদ্ধার্থ সিংহ



সত্যিই কি তাই! নাকি ওটাও আকাশে পাতা সুড়ঙ্গের মতোই জলের তলায় পাতা আর একটা ফাঁদ!
চমকে উঠল সায়ন। ওটা কী? এক ঝাঁক আকাশচাকি না! এ কী! একটা কৃষ্ণবর্ণ ঘূর্ণাবর্ত হু-হু করে ওগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে না! সমুদ্রের জল এ রকম দুধ সাদা হয়ে গেল কী করে! এ কী ঢেউ রে বাবা! কোনওটাই যে আট-দশ তলার চেয়ে কম নয়। চার দিক থেকে কেমন অদ্ভুত একটা কুয়াশা যেন তাদের জাহাজের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।



জল ফুড়ে হঠাৎ হঠাৎ সাপের মতো ফণা তুলে লাফিয়ে উঠে যেন আকাশটাকে ছুঁতে চাইছে। ওটা জলস্তম্ভ নাকি বড়শির মাথা! তাদের জাহাজটাকে টেনে জলের অতলে নিয়ে যাবে না তো! আর কিছু ভাবতে পারছে না সায়ন। কিছুক্ষণ আগেই তার মনে হয়েছিল, তার কেবিনে কেউ একজন ঢুকেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠেছিল, কে?



ঘাড় ঘুরিয়েও দেখেছিল। না, কাউকে সে দেখেনি। কয়েক মুহূর্তমাত্র। তার পরেই জাহাজের কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চমকে উঠেছিল সে। এমনিতেই খুব মন খারাপ তার। মেক্সিকোতে তার দারুণ কাটবে ভেবেছিল সে। কিন্তু এ কী! ওখানে যাওয়ার আগেই এত সমস্যা! ওর মেজ মামা যে এয়ারলাইন্সের বিমানে করে ওদের যেতে বলেছিলেন, সেই বিমানটা ছিল কানেকটিং ফ্লাইট। বিভিন্ন জায়গায় ড্রপ করতে করতে যায়। ও ই-মেল পাঠাতেই ওর মেজ মামা ওর মা-বাবার টিকিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল একদম মেক্সিকো পর্যন্ত।



আর তার টিকিটটা ফ্লোরিডা অবধি। তার মেজ মামার এক ক্লাসমেট, যিনি এখন তার মামার সঙ্গে ওই একই অফিসে কাজ করেন, বর্তমানে ফ্লোরিডায় পোস্টিং, তিনি নাকি ওকে বিমানবন্দর থেকে কালেক্ট করে পরের জাহাজেই মেক্সিকো রওনা হবেন। মামার ব্যবস্থাপনায় তাই হয়েছিল। মেজ মামার সেই বন্ধু তাকে খুব যত্নআত্তি করেছিলেন। এটা ওটা খাইয়েছিলেন। নিজে ড্রাইভ করে বিমানবন্দর থেকে জাহাজঘাঁটিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।


 দারুণ লাক্সারি একটা কেবিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাজ ছাড়ার খানিক আগে থেকেই সেই ভদ্রলোক যে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন, ও আর তার হদিশ পায়নি। তাঁর খোঁজে কত বার উপরের ডেকে গেছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন, সহ-ক্যাপ্টেন, এমনকী ক্রুদেরও বারবার জিজ্ঞেস করেছে তাঁর কথা। কিন্তু কেউই তাঁর কথা বলতে পারেননি। বরং সবাই একই কথা বলছেন, ওঁকে পাচ্ছ না তো কী হয়েছে? আমরা তো আছি। তোমার কী লাগবে বলো?



কিছুক্ষণ আগে জানালার পাশে বসে সায়ন যখন ভাবছিল, লোকটা কোথায় যেতে পারেন! কোথায়! ঠিক তখনই কেবিনের জানালা দিয়ে ও দেখেছিল, চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে গেছে। কুয়াশা না ধোঁয়া ঠিক বুঝতে পারছিল না! আকাশটার রংটাও মাছের পিত্তির মতো গাঢ় হয়ে গেছে। সমুদ্রটাকেও কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে! তাই খাট থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে নেমে কেবিন থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ডেকে পা দেওয়ার আগেই ও অবাক। তা হলে কি জানালা দিয়ে ও এতক্ষণ যা দেখছিল, সব মিথ্যে? ইলিউশন? হতে পারে! হতেই পারে!


কেন যে সে এখানে আসার আগে মেক্সিকো এবং তার আশপাশের ইতিহাসটা জানার জন্য অতগুলো বই পড়েছিল! না পড়লে তো আজ তার এই ভয়ানক দশা হত না! হঠাৎ ও শুনতে পেল কতগুলো লোকের হইচই। সবাই কী যেন বলাবলি করছে! তাদের কথা শুনেই ও বুঝতে পারল, না। বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেলের ভিতর দিয়ে এলেও তাদের জাহাজ ওই ভয়ঙ্কর হাতছানির খপ্পরে পড়েনি। আর পড়বেও না। কারণ, তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। ওই তো, এখান থেকে জাহাজঘাঁটিটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কতক্ষণই বা আর লাগবে!



পিছন থেকে কে যেন তার কাঁধের ওপরে একটা হাত রাখল। সায়ন ঝট করে পিছন ফিরে দেখে মেজ মামার সেই বন্ধুটা। এতক্ষণ কোথায় ছিলে গো? প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন, তোমার সঙ্গেই তো ছিলাম। বুঝতে পারোনি? সারাক্ষণ অত ঘোরের মধ্যে থাকলে পাশের লোকটার অস্তিত্ব টের পারে কী করে? চলো, এ বার আমাদের নামতে হবে। এই এক্ষুনি খবর পেলাম, তোমার মা-বাবাকে নিয়ে তোমার মেজ মামা তোমার জন্য জাহাজঘাঁটিতে অপেক্ষা করছেন। কী নামবে তো?



সায়ন ফিক করে হেসে শুধু মাথা কাত করল।



সমাপ্ত




সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি - ক্লিক করুন