Saturday, January 25, 2020

বার্মুদা রহস্য -- পর্ব - ২৭ - সিদ্ধার্থ সিংহ



sahityalok.com


বার্মুদা রহস্য -- পর্ব - ২৭ - সিদ্ধার্থ সিংহ



তিনি বলেছেন, যখন টর্নেডো ঝড় ধেয়ে আসে, তখন তাকে দেখে মনে হয়, লম্বা ও সরু একটা ফানেল বুঝি ছুটে আসছে। ওই রকম এক-একটা ফানেলের মতো কোনও কিছু পৃথিবীতে এসে স্ট্র দিয়ে পানীয় টেনে নেওয়ার মতো করে যেটা ওরা নিতে চায়, সেটা শুষে তুলে নেয়। তার পর হুস করে উধাও হয়ে মেরু প্রদেশ বা তারও চেয়ে আরও অনেক দূরে কোনও এক গোপন জায়গায় সেগুলো রেখে আসে।



তাঁর কথার সমর্থনে তুলে ধরা যেতে পারে সেই অভিজ্ঞ পাইলটের কথা। যিনি সাবা-ব্যাংক নিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন বাহামা দ্বীপের ফিপোর্ট থেকে আমেরিকার পাম বিচে। হঠাৎ তিনি দেখলেন, সামনে পিছনে যত দূর চোখ যায়, তত দূর পর্যন্ত একটা কৃষ্ণবর্ণ সুড়ঙ্গ। তার মানে তিনি সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে পড়েছেন। কীসের সুড়ঙ্গ এটা! মেঘের! নাকি ধোঁয়ার! নাকি অন্য কোনও কিছুর! নাকি শুধুই কুয়াশার! তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বিমান চালাচ্ছেন। এ সব অভিজ্ঞতা তাঁর আছে।



 তিনি বুঝতে পারলেন, সে সব কিছু নয়। তবে কি এটা গ্যাসের সুড়ঙ্গ। কিন্তু যে গ্যাসই হোক না কেন, তার তো একটা গন্ধ থাকবে! তিনি কিন্তু কোনও গন্ধ পাননি। তা হলে ওই সুড়ঙ্গটা কীসের! এই সুড়ঙ্গের কথা আমরা কোনও দিনই জানতে পারতাম না, যদি না তিনি ওই সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। তিনি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন নাকি তাঁর বিমানটাকে ধাক্কা দিয়ে কেউ ওই সুড়ঙ্গ থেকে বার করে দিয়েছিল, তিনি অবশ্য তা বলতে পারেননি।



ওই পাইলট কী বলেছিলেন এড স্নেডেকার জানতেন না। তবু তিনি দাবি করেছিলেন, যাঁরা এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন, আমি আমার এই দু’চোখ দিয়ে নয়, আমার যে তৃতীয় চক্ষু আছে, সেটা দিয়ে আমি তাঁদের দেখতে পাই। তাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলি। ওঁরা এই পৃথিবীতে আর কোনও দিনই আসতে পারবেন না। কিন্তু তাঁরা আছেন। বহাল তবিয়তেই আছেন। এবং তাঁরা যে যে-বয়সে গিয়েছিলেন, তাঁরা ঠিক সেই বয়সেই স্থির হয়ে আছেন। তাঁদের কারও বয়স বাড়েনি। যে যেমন দেখতে ছিলেন, ঠিক তেমনই আছেন। তাঁদের কোনও পরিবর্তন হয়নি।



তবে তাঁর মতে, সবাই যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে একটা ফাঁকা জায়গাতেই আছেন, তা কিন্তু নয়। কিছু কিছু মানুষকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এই পৃথিবীর বাইরে আর এক পৃথিবীতে। এ সব নাকি তিনি জেনেছেন, ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের একজন পাইটলের কাছ থেকে। উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে যিনি উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। লোবসাং রামপা বলে এক তিব্বতী লামার সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। আর তার কাছ থেকেই তিনি জানতে পেরেছেন বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেল সম্পর্কে অনেক অজানা কথা।


শুধু তিনি নন, তাঁর মতো আরও অনেক বিজ্ঞানী এখন জানতে পেরেছেন, কেবল ঝড়-তুফানের মধ্যেই এই রহস্য সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, তা যদি হত, তা হলে ঝড়জলের পূর্বাভাস আন্দাজ করে ওই সব নিখোঁজ হওয়া জাহাজ-টাহাজগুলো আগেই তড়িঘড়ি করে বিপদ সংকেত পাঠিয়ে দিত। কিন্তু সব সময় তা হয়নি। আবার পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ থাকা সত্বেও হঠাৎ করে চিরদিনের জন্য কেউ হারিয়ে যেত না।


কোনও কোনও বিজ্ঞানী তাঁর মতবাদকে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ও সব কিছু নয়। আসলে তরিৎ চুম্বক, মহাকর্ষ বা নভোমণ্ডলের প্রভাবেই এ সব হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীও মনে করত, এই রহস্যের আড়ালে সে রকমই কিছু একটা আছে। তাই কয়েক জন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে তারা 'প্রজেক্ট ম্যাগনাম' নামে একটা কমিটি গঠন করল। যাদের কাজ ছিল, তরিৎচুম্বক, মহাকর্ষ বা নভোমণ্ডলের কোনও কারসাজিতে এই সব কাণ্ড ঘটছে কি না, তা গবেষণা করে বার করা।



নেভাল রিসার্চ অফিস থেকে কয়েক বছর আগে বিখ্যাত জিওফিজিসিস্ট ড. জন ক্যারিস্টু অনেক হিসেব-নিকেস করে বলেন, আমরা যে মহাকর্ষ শক্তির কথা জানি, সেটা ছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক সংমিশ্রণে আর একটা মহাকর্ষ শক্তি আছে, সেটা সমুদ্রের ভিতরে এবং বাইরে একদম আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করে।


ওঁরা ছাড়াও, অন্য আরও অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর নানা জায়গায় বিভিন্ন রকমের চুম্বক-ক্ষেত্র আছে এবং তাদের ক্রিয়াকলাপও বিভিন্ন রকমের। এ নিয়ে কেউ কেউ তো গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়া বিশাল বিশাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। এবং তা নিয়ে তুমুল হইচইও হয়েছে বিজ্ঞানী মহলে।


ক্যানেডিয়ান সরকারের তত্ত্বাবধানে উনিশশো পঞ্চাশ সালে উইলবার বি স্মিথ নামে এক ইলেকট্রনিক বিজ্ঞানী চুম্বক ও মহাকর্ষ নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি বায়ু মণ্ডলের কিছু ক্ষেত্র আবিষ্কার করেন, যার নাম দেন--- রিডিউসড বাইন্ডিং। এক একটি রিডিউসড বাইন্ডিং ক্ষেত্রের ব্যাস হাজার ফুট। আর উচ্চতার তো কোনও সীমা-পরিসীমাই নেই। তাঁর মতে, এগুলো মাঝে মাঝেই চরে বেড়ায় আবার হঠাৎ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার অন্য কোনও কোনও অঞ্চলেও দেখতে পাওয়া যায়।



তিনি লক্ষ্য করে দেখেছিলেন, যেখানে যেখানে রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই রিডিউসড বাইন্ডিং ক্ষেত্র আছে। এই রিডিউসড বাইন্ডিংয়ের প্রভাবেই নাকি কম্পাস ও রেডিও বিকল হয়ে যায়। মানুষের মাথার স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে মাথা ঝিমঝিম করে। সব বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তাও তখন আর বুঝে উঠতে পারেন না। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, এই রিডিউসড বাইন্ডিং কিন্তু আমাদের জানা নানান আদলের বাইরেও আরও একটা চেহারা নিতে পারে।



আইনস্টাইন এক সময় বলেছিলেন, আমরা তিনটে ডাইমেনশনের সঙ্গে পরিচিত। দৈর্ঘ্য, প্রস্ত আর ব্যাস। কিন্তু এগুলো ছাড়াও মানুষের যেমন তৃতীয় চক্ষু বলে একটা অদৃশ্য জিনিস আছে, ঠিক তেমনি চতুর্থ ডাইমেনশন বলেও একটা জিনিস আছে। সেটাকে বলা হয় টাইম বা সময়। যেখানে গেলে অতীতে ফিরে যাওয়া যায় আবার ভবিষ্যতেও পৌঁছে যাওয়া যায়।


যারা নিরুদ্দেশ হয়েছেন বা যে সব জাহাজ-উড়োজাহাজ হারিয়ে গেছে, তারা হয়তো ওই টাইমের খপ্পরে পড়ে এমন কোনও জায়গায় চলে গেছে, যেটা হয় অতীত, নয়তো ভবিষ্যৎ। অথবা ওই দুটির মাঝামাঝি কোনও একটা জায়গায়। কিন্তু তারা যে আদতে কোথায় গেছে, তা কিন্তু হলফ করে কেউই বলতে পারেননি। তবে কয়েক জন বিজ্ঞানী বলেছেন, নভোমণ্ডলে নানা রকমের ক্ষুদ্রাণুক্ষুদ্র অজস্র কণিকার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেগুলো আগেও ছিল, এখনও আছে।


 এই সব কণিকার প্রভাবে ও তরিৎচুম্বকের সহায়তায় বা অন্য কোনও ভাবেও অভাবনীয় বহু কিছু ঘটতে পারে। যেমন যে কোনও কিছু, এমনকী মানুষ পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। একই জিনিস একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। আবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরেও ফের সবার চোখের সামনে ধরা দিতে পারে।



দ্য বার্মুডা ট্র্যাঙ্গেল-এর লেখক চার্লস বেরলিটজ রহস্যের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে করতে সম্ভাব্য অনেকগুলো কারণ বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, সমুদ্র গর্ভে বিরাট একটা গিরিখাদ আছে। তার নাম--- টঙ্গ অব দ্য ওশেন। যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়--- মহাসমুদ্রের জিভ। সেটা মাঝে মাঝে বের হয়ে এসে যে জাহাজ বা ডুবোজাহাজকে সামনে পায়, তাকেই তার লম্বা আঠালো জিভ দিয়ে ধরে নিজের ডেরায় নিয়ে চলে যায়।



তিনিই জানান, কানাডার কিংস্টনে সেন্ট লরেন্স নদীগর্ভে একটা খাদ আছে। যার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আকরিক লোহা বা উল্কা পিণ্ড আছে। ফলে ওখান দিয়ে কোনও জাহাজ-টাহাজ গেলেই কম্পাসের কাঁটাগুলো অকেজো হয়ে যায়। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জেনারেটর চালু করলেও জাহাজের কোনও বাতি জ্বলে না। সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব দ্য আনএক্সপ্লেইন-এর প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী আইডান টি স্যান্ডারসন অবশ্য সেই পুরনো গল্পই শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের অভ্যন্তরে যে সভ্য প্রাণী আছে, তারাই মাঝে মধ্যে সমুদ্র পৃষ্ঠে উঠে এসে মানব সভ্যতার নিদর্শন সংগ্রহ করে আবার সাগরের অতলে লুকিয়ে যায়।


চলবে  ---------------

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি - ক্লিক করুন