Tuesday, November 5, 2019

আইসক্রীম ------ সঞ্চিতা রায়(ঝুমা ) কল্যাণী ,নদীয়া


sahityalok.com


আইসক্রীম আমাদের প্রায় সকলেরই একটি বিশেষ ভালবাসার খাবার। আইসক্রীম ভালবাসেনা এমন মানুষ বেশ বিরল। তাই আমাদের এই পুজো সংখ্যায় আইসক্রীম নিয়ে ছোট প্রবন্ধ হিসাবে কিছু লিখতে মন চাইলো। তথ্যগুলো যথাসম্ভব সংগ্রহ করে শব্দ দিয়ে গেঁথে ফেলার চেষ্টা করছি।
                                   আচ্ছা আইসক্রীম শব্দের কোনো সঠিক বাংলা আছে কি?অনেকে আইসক্রীম কে কুলফী,মালাই,বা একসঙ্গে কুলফিমালাই ইত্যাদি  বলে থাকেন। আবার আক্ষরিক ভাবে বললে আইস মানে বরফ আর ক্রীম মানে ননী ,নবনী ইত্যাদি ,অর্থাৎ  একসঙ্গে বললে বরফ নবনী। কিন্তু এই কথাটি প্রচলিত নয়। যাই হোক না কেন,আইসক্রীম কে যে নামেই ডাকো তা খেতে সুস্বাদু এবং সুন্দর।            
            
   এবার আসি,আইসক্রীম এর ইতিহাসে। কবে কিভাবে পৃথিবীতে প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল তা খুব স্পষ্ট ভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ঘেটে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইওরোপের মানুষ বরফের সাথে মিষ্টি মিশিয়ে একধরণের পানীয় গ্রহণ করতো সেটাই আইসক্রীমের আদি রূপ। তথ্য ঘেঁটে অনেকে বলেছেন প্রাচীন গ্রীসে নাকি বরফের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।
গ্রীক চিকিৎসক হিপ্পোক্র্যাটস  নাকি বরফে মধু মিশিয়ে খাওয়ার কথা বলতেন রোগীদের।   আবার অনেকে মনে করেন, যে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী তে রোম সম্রাট নিরো র রাজদরবারে পাহাড় চূড়া থেকে বরফ আনিয়ে সুরা ফলের রস ,মধু মিশিয়ে এক ধরণের পানীয় গ্রহণের যে রেওয়াজ ছিল, সেটাই আইসক্রীমের আদিরূপ। কেউ কেউ বলেন,মার্কো পোলো প্রাচ্য পরিক্রমা সেরে ইতালিতে ফেরার সময় নাকি বরফ থেকে পানীয় বা আইসক্রীমের রেসিপি নিয়ে এসেছিলেন।
তিনি যখন চীন সম্রাট কুবলাই খানের দরবারে এসেছিলেন,একদিন বেজিং(পিকিং) এর রাস্তার  বেড়ানোর সময় দেছেন, একজন লোক ঠেলাগাড়ি তে করে বরফ জমাট বাঁধা দুধ আর ফলের রসের মিশ্রণ বিক্রি করছেন। খাবার টি মার্কো পোলোর ভাল লাগে। তাই তিনি রেসিপীটি ইতালিতে নিয়ে আসেন।    
                           ইতালির মেয়ে ক্যাথেরিন ফ্রান্সের রাজপুত্রকে  বিয়ে করে যখন ফ্রান্সে আসেন তখন সঙ্গে নিয়ে আসেন কিছু পাচক। তারা ক্যাথরিনের শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে আইসক্রীম খাওয়ান। ফ্রান্সেও জনপ্রিয় হয় আইসক্রীম। ফ্রান্সের মেয়ে হেনরিয়েটা মারিয়া ইংল্যাণ্ডে যখন বিয়ে করে আসেন,তার সাথে আইসক্রীমের রেসিপী পৌঁছায় ইংল্যাণ্ডে।  
                     
  ইংরেজরা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করলে আমেরিকায় প্রচলন হয় আইসক্রীমের। ১৭৪৪ সালে ১৭ই মে মেরিল্যাণ্ড প্রদেশের গভর্নর উইলিয়াম ব্লাডেন এর বাড়ির নৈশভোজে জনৈক ব্যক্তি  আইসক্রীম খেয়ে তাঁর স্ত্রীকে আইসক্রীম এর প্রশংসা করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সম্ভবত ওটাই ওদেশে আইসক্রীম এর সূত্রপাতের সময়। শোনা যায় প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নাকি আইসক্রীমের পিছনে অনেক টাকা ব্যয় করেছিলেন।
আমাদের দেশে প্রথম দিকে বরফ স্যাকারিন কৃত্তিম রঙের মিশ্রণকে আইসক্রীম  হিসাবে খাওয়া হ’ত। মোঘল রাজারা নাকি হিন্দুকুশ পর্বত থেকে বরফ আনিয়ে তার সঙ্গে ফল কেটে মিশিয়ে একধরণের সরবতের মত খেতেন। কুলফি আইসক্রীম কে ভারতের আদি আইসক্রীম বলে মনে করা হয়। এটাকে “দক্ষিণ  এশিয়ার ঐতিহ্যপূর্ণ আইসক্রীম ”বলে বর্ণনা করাহয়েছিল। মনেকরা হয় এটি পার্সিয়ান আইসক্রীম বাসটানি সোন্নাটিকে অনুকরণ করে করা হয়েছিল।
   একসময় কাঠি চুষে খাওয়া হ’ত। ঠেলাগাড়ি আইসক্রীম আইসক্রীম বলে হাঁক দিয়ে যেত। খিদিরপুরে এল ম্যাগনেলিয়া। সম্ভবত ৬০এর দশকে কোয়ালিটি আইসক্রীম এসে আইসক্রীম কে জনপ্রিয় করে। এরপর একে একে রলিক,তুলিকা,আমূল ভাইস মেট্রো ইত্যাদি আইসক্রীম বাজারে জনপ্রিয় হয়।  
                                              ১৮৫১ সালে মেরিল্যাণ্ডে জেকব ফুসেল নামে এক ব্যাক্তি আইসক্রীম এর প্রথম বিপনন কেন্দ্র চালু করেন। ক্রমে তা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে। ১৮৫১ সালে বাল্টিমোরে প্রথম কারখানায় আইসক্রীম উৎপাদন শুরু হয়।    
                                 কারখানায় আইসক্রীম  তৈরীর জন্য সাধারণত দুধ,ক্রীম(দুগ্ধজাত ফ্যাট),দুগ্ধজাতীয় প্রোটিন,জল,গ্লুকোজ,মাখন বা মাখন তেল,চিনি,সুগন্ধী ,স্টেবিলাইজার ও ইমালসিফায়ার (জল তৈলাক্ত পদার্থ মিশতে সাহায্য করে ও আইসক্রীমকে মসৃণ থাকতে সাহায্য করে)আইসক্রীমে বৈচিত্র আনতে ভ্যানিলা,স্ট্রবেরী,চকোলেট ,কাজু কিসমিস ,অরেঞ্জ ফ্লেভার,বাটার স্কচ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।  
                     
   প্রাথমিক উপাদান বা উপকরণ  গুলোকে প্রথমে মিক্সিং মেশিনে ভাল করে মেশানো হয়। তারপর উচ্চ উষ্ণতায় পাস্তুরাইজেশান পদ্ধতিতে জীবানুমুক্ত করে পরিশোধন করা হয়। এরপর  স্টেবিলাইজার ও ইমালসিফায়ার মিশিয়ে হোমোজিনাইজার যন্ত্রের মাধ্যমে ফ্যাটকে সূক্ষাতিসূক্ষ করে ভেঙে মসৃণ করাহয়।  এরপর ফলের চূর্ণ বা সুগন্ধী  রঙ ইত্যাদি মেশানো হয় এবং মাইনাস ৪ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে কিছুক্ষণ রাখা হয়।  
এরপর একটানা হিমায়ক(কন্টিনিয়াস ফ্রিজার)এ মোটামুটি মাইনাস ৫ ডিগ্রী তে রেখে ঠাণ্ডা হাওয়া দেওয়ার পর বেরিয়ে আসে আইসক্রীম । এরপর কাপ ,ব্লক ইত্যাদিতে প্যাকিং করে মাইনাস ৩০ মাইনাস ৪০ সেন্টিগ্রেড  ডিগ্রী তে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এরপর প্রয়োজন মত বিপণন করা হয়।
                                                              যেহেতু ছোট থেকে বড় সকলেরই খুব প্রিয় খাবার এই আইসক্রীম ,তাই ঘরে আইসক্রীম তৈরী করার একটা প্রাথমিক ধারণা দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। ধরা যাক ঘরে ভ্যানিলা আইসক্রীম তৈরী করছি,প্রথমে মিল্ক পাউডার ও জল ভাল করে মিশিয়ে ফেটিয়ে নিতে হবে। আঁচে বসাতে হবে। ফুটে উঠলে চিনি ভালোভাবে মেশাতে হবে। এক্ষেত্রে  চিনির সাথে যদি জি এম এস ও সি এম সি মেশালে ভাল হয়।
এগুলো বড়বাজার,এজরা স্ট্রীটে পাওয়া যায়। এতে আইসক্রীম মোলায়েম হয়। এবার ভাল করে নেড়ে নিতে হবে। এবার একটু এরারুট বা কাস্টার্ড পাউডার  মিশাতে হবে। এবার মিশ্রণটা ঠাণ্ডা করতে হবে। ঠাণ্ডা হলে ভ্যানিলা এসেন্স মিশিয়ে আর একবার ভাল করে নাড়তে হবে। এবার নির্দিষ্ট  কৌটো বা আইসক্রীম কাপে রেখে ,ডিপ ফ্রিজে (ডিপ ফ্রিজকে কোল্ডেস্ট পয়েন্টে রেখে )রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরে পরিবেশন করা যাবে।
এটা একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হ’ল মাত্র। ভ্যানিলার বদলে যে যা ফ্লেভার পছন্দ করেন,ব্যবহার করতে পারেন। যেমন স্ট্রবেরী ফ্লেবার বা চকোলেট আইসক্রীম তৈরী করতে চাইলে কোকো পাউডার।  চাইলে ঘরে কাসাটা আইসক্রীম  ও তৈরী করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগে থেকে ভ্যানিলা ও স্ট্রবেরী আইসক্রীম চকোলেট আইসক্রীম  তৈরী  করে রাখতে হবে  পূর্ব বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী। আর আনতে  হবে ফ্যাটলেস স্পঞ্জ কেক।
ঠাণ্ডা কেকটার উপর প্রথমে ভ্যানিলা তারপর স্ট্রবেরী তারপর চকোলেট স্তর দিতে হবে। ডিপফ্রিজের পয়েন্ট আগে থেকেই ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে। ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে আইসক্রীম রাখার পাত্রটাও। ঢাকা দিয়ে ডিপফ্রিজে রাখতে হবে। সম্পূর্ণ জমে গেলে কেটে পরিবেশন করা যাবে।              
    কাঠি আইসক্রীম বা ললিপপ আইসক্রীম ও তৈরী করা যায় বাড়িতে। এক্ষেত্রে দুধ,কনডেন্সন্ড মিল্ক,জিলেটিন,অরেঞ্জরঙ,অরেঞ্জ এসেন্স,চিনি ইত্যাদি লাগবে। দুধ,কনডেন্সন্ড মিল্ক ও চিনি মিশিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে নেড়ে নিতে হবে।
নামিয়ে জিলেটিন মিশিয়ে দুধ ঠাণ্ডা করতে হবে। ফ্রিজের পয়েন্টকে সব চেয়ে ঠাণ্ডা করে মিশ্রটি কিছুক্ষণ রেখে অল্প জমলে বাইরে  এনে অরেঞ্জ এসেন্স ও রঙ মিশিয়ে স্টিক আইসক্রীম তৈরীর পাত্রে(কিনতে পাওয়া যায়)ঢেলে কাঠের স্টিক লাগিয়ে জমতে দিতে হবে। নির্দিষ্ট  পাত্রটি না থাকলে কাগজের কাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। জমে গেলে কাগজটা খুলে নিতে হয়।    
     
   পরিশেষে একটা মজার কথা বলে শেষ করছি। আইসক্রীম সাধারণত কোনো পার্টিতে ডেসার্ট হিসাবে খাওয়া হয়। Stressed  কথাটার উল্টালে  desserts কথাটি পাওয়া যায়।  তাই বলা যেতে পারে Stressed  ও  desserts পরস্পরের পরিপূরক বা     desserts খেলে Stressed হওয়া থেকে বাঁচা যায়। এটা মজা। কিন্তু এটা সত্য যে আইসক্রীম খাওয়ার মধ্যে সত্যিই একরাশ মজা ও আনন্দ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর স্বাদে ভরপুর আরো অনেক আইসক্রীম আমরা পাব,এই আশা রাখি।    
তথ্য সংগ্রহ ইন্টারনেট ও কিছু পত্রপত্রিকা