Sunday, November 3, 2019

বাবা ---- সুব্রত মজুমদার

বাবা     ----   সুব্রত  মজুমদার


                                           আজ সকালবেলায় মুখাগ্নিতলায় বসে আছি, খালি গা, পরনে একটা ধুতিকে দু'টুকরো করে কেটে তার একটা টুকরো। কাল বাবা আমাদের ছেড়ে সাধনোচিত নামে গমন করেছেন। চোখের জল মুছে বাবার অগ্নিকার্য্য করলাম। পুরোহিত মশাই বগলাচরণ ভট্টাচার্য্য আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "দুঃখ করো না, যিনি যাবার তিনি তো যাবেনই।
 
 
তুমি মন স্থির রেখে পিতৃকার্য্য কর। মনে রেখো এটা পিতৃঋণ। জানো তো শাস্ত্রানুসারে পৃথিবীতে মানুষের তিনটি ঋণ,-  দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ । এই তিন ঋণ শোধ করা অবশ্যকার্য্য। তাই মনের দুঃখকে অবদমন করে নিশ্চিন্তে কর্তব্য কর।" 
আমি কেঁদে ফেললাম। আমার চোখ হতে জল গড়িয়ে পড়ে সিক্ত কাপড়কে আরও ভিজিয়ে তুলল। বগলা ভটচায মন্ত্র বলে চললেন, 
 
".. শ্মশান অনলে দগ্ধসি পরিত্যক্তোসি বান্ধবৈঃ
ইদং নীরং, ইদংক্ষীরং অত্র স্নাহি ইদং পিব
আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়
অত্র স্নাত্বা, ইদং পীত্বা স্নাত্বা, পীত্বা সুখি ভব।..." 
 
হে শ্মশান অনলে দগ্ধ আকাশস্থ নিরালম্ব নিরাশ্রয় বায়ুভূত তুমি এই স্নান পান ও ভোজনে সুখী হও।" 
মুখাগ্নি ও সপিণ্ডকরন শেষ হলে আমি উঠে এলাম। বগলা ভটচাযও আমার সঙ্গে এলেন। মুখাগ্নির পর অগ্নিকর্তাকে আর মৃতের মুখদর্শন করতে নেই তাই দূরে সরে বসলাম। বগলা ভটচায আমার পাশে বসলেন। তারপর পিঠে হাতদিয়ে বললেন,"সৎকার কোথায় করবে ? "
বললাম," তারাপীঠে । "


ভটচায মশাই বললেন, "হুমম্ !" 
বললাম, "মৃত্যুর পর কি আর কিছু আছে ভটচায মশাই, যা যাবার আমারই গেল।"  আমি কাঁদতে লাগলাম। 
ভটচায মশাই আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, "মৃত্যুই শেষ নয় মাষ্টার, মৃত্যু জীবনের একটা পরিবর্তন মাত্র। গরুড়পুরাণ মতে মৃত্যুর পর আত্মাকে দক্ষিণ দিকের একটা দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গ পার করতে হয়। এই সময় যাতে আত্মা পথটি সহজে অতিক্রম করতে পারে তার জন্য মৃতদেহের পাশে জ্বলন্ত প্রদীপ রাখা হয়। 
 
 
 
আত্মা একটা সুতো দিয়ে দেহের সাথে জোড়া থাকে। মৃত্যুর পূর্বে এই সংযোজক সুতো যাকে অ্যাস্ট্রাল কর্ড বলে মৃত্যু ছাড়া সেই অ্যাস্ট্রাল কর্ড দেহ আর আত্মার মধ্যে সংযোগ বজায় রাখে। যোগিদের ক্ষেত্রে আত্মা দেহ হতে বের হয়ে গেলেও অ্যাস্ট্রাল কর্ডের মাধ্যমে দেহের সঙ্গে সংযোগ বজায় থাকে। 
 
 
 
আত্মা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না, তাই মৃত্যুর পরেও দেহের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সচলতা বজায় থাকে। আত্মা দেহ হতে বের হয়েও দেহের সঙ্গেই থাকে। এসময় সে নানান আওয়াজ শুনতে পায়, এগুলো হল আশেপাশের মানুষজনের চিন্তাভাবনা। সে সবসময় তার নিকটজনকে বলার চেষ্টা করে যে 'আমি মরিনি।'  কিন্তু কেউ শুনতে পায় না। 
 
ধীরে ধীরে আত্মা বুঝতে পারে যে সে মৃত (অর্থাৎ দেহ হতে বিচ্যুত )। দাহকার্য্যের পর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর সাতদিন ব্যাপি আত্মা সেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় যেখানটা তার অতিপরিচিত ও অতিপ্রিয় জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। 
 
 
সাতদিন পর আত্মা একটা সুড়ঙ্গপথে ভ্রমণ করে। এসময়টাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। এসময় আত্মার মঙ্গলকামনায় প্রার্থনা করতে হয়। কোনওরকম খারাপ আচরণ এসময় করতে নেই। এই সদাচরণ প্রার্থনাই এই দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে আত্মার শক্তি হিসেবে কাজ করে। আত্মাকে প্রদত্ত পিণ্ডোদক আত্মার খাদ্য ও পানীয় হয়। এই সুরঙ্গপথের শেষে একটা বিশাল আলোক অবস্থান করছে। 
 
 
এরপর সাধারণ আত্মারা যায় চন্দ্রপথে এবং নির্বানপ্রাপ্ত আত্মারা সৌরপথে যায়। চন্দ্রপথ স্বল্পপথ ও সৌরপথ দীর্ঘপথ। " এতটা বলেই থামলেন বৃদ্ধ ।
আমি বললাম," আর ভূত প্রেত ? "
 
বগলা ভটচায তার গায়ের কাপড়টা ভালো করে জড়িয়ে নিতে নিতে বললেন," আত্মা আর ভূত এক নয়। ভূত হল নিকৃষ্ট শ্রেণীর অপদেবতা। তুমি তো কবিতা লেখার চেষ্টা করো তো কবিতার ভাষাতেই শ্রদ্ধাঞ্জলি দাও। "
আমি বললাম,
 
" যে মৃত্যু তোমাকে মহান করেছে সেই মৃত্যুরে বোলো
   সে পেয়ে গেল অনেক কিছুই, আমাদের যা ছিল। 
তুমি ছিলে যবে বুঝতে পারিনি তখন তোমার দাম, 
তুমি ছিলে মনের শান্তি, ব্যাকুল প্রাণের আরাম। 
বিশ্ব যখন ঝঞ্ঝার মুখে তখন শিয়রে তুমি 
হলে আশ্রয়, সব বাধা ভয় টুটে গেল; শির চুমি
তুমিই ঢালিলে আশীর্বাদের দূর্বা কণকধান্য, 
নিজে অভূক্ত থেকেও করালে মোদের পাতে নবান্ন। 
দিতে পারি নাই প্রতিদানে শুধু নিয়েছি দু'হাত ভরে,
তুমি লেখোনাই তাই আমি কবি তোমার কলম করে। "
 
 
আমার দু'চোখে বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, বগলা ভটচাজ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শূন্যপানে। আমার বাবাকে কি চোখে পড়ল তার ? হয়তো বা, কিম্বা ন, মহাকালই জানেন ।