Saturday, October 12, 2019

সিংহবাহিনী রহস্য  পর্ব - ৪  সুব্রত মজুমদার

সিংহবাহিনী রহস্য   পর্ব - ৪   সুব্রত মজুমদার


সন্ধ্যাবেলায় বিক্রমকে পাগলা ইঞ্জিনিয়ারের কথা বলতেই বিক্রম বলল, "সবই শুনেছি বৎস। আমার ধারণা পাগলা ইঞ্জিনিয়ার ওরফে শ্রীমান বিশাল বন্দ্যোপাধ্যায় এইসব অঘটনের সন্মন্ধে অনেককিছুই জানেন। কিন্তু কেউ বা কারা ওর পেছনে হাতধুয়ে পড়ে আছে। আর সেই লোকেদের ভয়েই বিশালবাবু পাগলের ভান করছেন।"

বিক্রমের কথা শুনে বুঝতে পারলাম, আমরা নিজেদের অজান্তেই একটা গভীর ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি। বললাম," তাহলে তো বিশালবাবুর যেকোনো সময় প্রাণসংশয় হতে পারে। "


বিক্রম পকেট হতে দুটো লজেন্স বের করে একটা আমার হাত দিয়ে অন্যটার র‌্যাপার খুলতে খুলতে বলল," অত সোজা নয় সায়ক, যদি বিশালবাবুকে মেরে ফেলা অতটাই সহজ হতো তাহলে বিশালবাবুর কবরে এতদিন দূর্বাঘাস বেরিয়ে যেত। ওরা বিশালবাবুকে ওয়াচে রাখছে। রাতের লোকদুটো সম্ভবত ওদেরই কেউ। আর হ্যাঁ, আজ রাত্রে আমি একটু বাইরে যাব। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে ভোলাদের বাড়িতে গিয়েছি। ওর বাবা নেমন্তন্য করেছিল। "


আমি সন্মতিসূচক মাথা নাড়লাম। বিক্রম লজেন্সটা মুখে পুরেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বিক্রম বেরিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর দেবলীনা আর অঘোরবাবু এলেন। অঘোরবাবু খাটের উপর জমিয়ে বসেই একটা হাঁই তুললেন। আমি বললাম," এল হাঁই ঘুমের ভাই.. "

অঘোরবাবু গোঁফে তা দিতে দিতে বললেন, "ঘুমোবার অবসর কি রে ভাই ! এই চারপাঁচদিন আমার শিরেসংক্রান্তি। কিন্তু বিক্রমকে তো দেখছি না, কোথায় গেল গোয়েন্দাপ্রবর ?"


দেবলীনাও বিক্রমের অদর্শনে হাহাকার ব্যক্ত করল। আমি বিক্রমের শেখানো বুলি আউড়ে দিলাম। দেখলাম দেবলীনা আর অঘোরবাবু দুজনেই বিক্রমের উপর চটে লাল। দেবলীনা মুখ ভার করে বলল," নির্ঘাত কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়েছে, আমি কালকেই বাড়ি চলে যাব। ওর যা খুশী ও করুক। "


অঘোরবাবু বললেন, "বাড়ি চলে যাবে কেন ? আমি তোমার বাবার মতোই, আমার ঘর মানে তোমারও। তুমি চিন্তা করো না দেবলীনা, মর্কটটাকে তোমার পায়ের তলায় ফেলতে যদি না পারি তবে আমার নামও অঘোর বাঁড়ুজ্জে নয়। " অঘোরবাবু সামনের টেবিলটার উপর সজোরে কিল মারলেন, টেবিলের উপর থাকা জলের বোতলটা নিচে গড়িয়ে পড়ে গেল।


এতসবকিছুর মধ্যেও আমাকে মাথা ঠান্ডা রাখতেই হলো। বিক্রম যখন নিষেধ করেছে তখন এর পেছনে কোনো রহস্য নিশ্চয়ই আছে। আমি অঘোরবাবু আর দেবলীনাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলাম। রাতের খাবারে অঘোরবাবু বা দেবলীনা কারোরই তেমন রুচি আছে বলে মনে হলো না। আমি কিন্তু বেশ পরিতৃপ্তি সহকারে পেটপুজো সম্পন্ন করলাম। দেবলীনা আমার দিকে রাগত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।

রাত্রে ভালো ঘুম হলো না। স্বপ্নে দেখলাম আমি বাঁদর হয়ে একটা আমগাছে চেপে বসে আছি। গাছভর্তি লাল টুসটুসে পাকা আম। আম খাচ্ছি আর আঁটিগুলো নিচে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছি । অঘোরবাবু আর দেবলীনা লাঠি হাতে গাছতলায় দাঁড়িয়ে। অঘোরবাবু চিৎকার করে বলছেন, "ব্যাটা পাজী বাঁদর, নেমে আয় বলছি। নাম হতচ্ছাড়া, নাম !"



হঠাৎ উপর হতে একটা পাকা আমের আঁটি অঘোরবাবুর মাথায় এসে পড়ল। আমি সচকিত হয়ে উপর দিকে চেয়ে দেখলাম মগডালের কাছাকাছি আরেকটা বীর হনুমান, - আর সেই হনুমান বাবাজী আর কেউ নয়, স্বয়ং বিক্রম। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বুদ্ধি গেল গুলিয়ে, আর ডাল হতে হাত আলগা হয়েই 'চিঁ-ধপ'।


গাছ থেকে পড়তেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে চেয়ে দেখলাম মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছি। ভাগ্য ভালো রুমে আর কেউ নেই, তা না হলে এটা রীতিমত একটা হাসির খোরাকে পরিণত হতো।
পরেরদিন সকাল সকাল উঠে স্নান করে নিলাম। দোলা আনতে হবে। দেবলীনার পরনে আজ আনারকলি কূর্তি আর জিন্স, অঘোরবাবু আগেরদিনের মতোই সাদা ধুতি আর ফুলহাতা স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরে দোলার সাথে সাথে চলেছেন। দেখা নেই কেবল বিক্রমের।


দোলা নদীর ঘাটে পৌঁছল, ঠাকুরমশাই মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে নবপত্রিকাকে স্নান করাতে লাগলেন। ".. রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা,দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী।"


আমি তন্ময় হয়ে মন্ত্র শুনছিলাম। মন্ত্রপাঠ শেষ হলে পেছনফিরতেই দেখি বিক্রম। বললাম," সারারাত কোথায় ছিলে ? অঘোরবাবু আর দেবলীনা তো খড়্গহস্ত হয়ে বসে আছে তোমার মুণ্ডু নেবে বলে। "
বিক্রম হো হো করে হেসে বলল," আমি কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছি, তাইতো ? " এই বলে আবার হাসতে লাগল। আমি বোকার মতো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কি বলবো ভাষায় কুলোলো না । ঠিক এসময় দেবলীনা হাজির, হাতে একখানা হাউই বাজি। হাউইটা বিক্রমের দিকে তুলে ধরে বলল," ইচ্ছে করছে এই হাউইবাজিতে বেঁধে উড়িয়ে দিই। অবশ্য তোমাকে আর ওড়াবার প্রয়োজন কি, দিব্যি উড়ছো।"



বিক্রম কান ধরে হাঁটুগেড়ে বসলো। দেবলীনা এবার হেসে ফেলল। দুজনের খুনসুটি দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। রান্নাঘরে আমার দেখা না পেয়ে আমাকে খুঁজতে খুঁজতে অঘোরবাবু এসে হাজির। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন," তোমাকে অনেকক্ষণ হতে খুঁজছি সায়ক। দেবলীনাকে নিয়ে তুমি ঠাকুর ঘরে যাও। ঠাকুরমশাই ডাকছেন। .... এই তো বিক্রমও চলে এসেছে। সারারাত কোথায় ছিলেন বলুন তো মশাই। এই বুড়ো মানুষটাকে কষ্ট না দিলে কি হয়না ?"



অঘোরবাবু চলে যেতে উদ্যত হতেই খবরের কাগজ নিয়ে ভোলা দৌড়তে দৌড়তে এল। ভোলার হাত হতে খবরের কাগজটা নিয়ে হেড লাইনগুলো দেখতে লাগলেন। হেডলাইন দেখতে দেখতে প্রথম পাতার ডানদিকের একটা হেডিংয়ে চোখ গেল অঘোরবাবুর।


'পুলিশের জালে ধৃত দুই বিদেশি স্মাগলার, গোয়েন্দা বিক্রমের বড়সড় সাফল্য '
নিজস্ব প্রতিনিধি : গতকাল রাত্রে সোনার বিস্কুটসহ ধৃত দুই। এদের মধ্যে একজন
পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত। পুলিশ অনেকদিন হতেই এদের উপর নজর
রাখছিল। লোকাল থানার আইসি নির্মল কুমার সরকারের বয়ানঅনুসারে
এই কাজের জন্য বিখ্যাত গোয়েন্দা বিক্রম মুখোপাধ্যায়ের সাহায্য নেওয়া
হয়, যদিও এরা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। পুরো গ্যাংকে ধরার জন্য জাল
বিছিয়েছে পুলিশ। '


পেপারটা নিয়ে বিক্রমের হাতে দিলেন অঘোরবাবু । বিক্রম বলল, "পঞ্চমীর রাতে এই দুই শয়তানই ঠাকুরদালানে এসেছিল চুরির উদ্দেশ্যে। আমার গুলিতে এদের একজন আহত হয়। এরপর আমি কাছাকাছি যত ডাক্তার ও মেডিকেল স্টোর ছিল সবার সাথেই যোগাযোগ করি।' শ্রীমা মেডিক্যাল স্টোর' এর ফার্মাসিস্ট দুই অপরাধীকে সনাক্ত করে। অবশেষে কাল রাতেই ক্যাচ কট কট। "



অঘোরবাবুর চোয়ালটা ঝুলে পড়লো। আতঙ্কজড়িত গলায় বললেন," কি সমস্যায় পড়লাম বলুন তো মশাই ! ঠাকুর ঘরে কি এমন আছে যে দুনিয়ার যত গুণ্ডা বদমাশ হাত ধুয়ে পেছনে পড়ে গেছে ! "
বিক্রম বলল," কিছু তো একটা আছেই অঘোরবাবু। লোকদুটোকে আচ্ছা করে পিটিয়েছে পুলিশ। কিচ্ছু খবর বের করতে পারেনি। ওরা টাকার বিনিময়ে কাজ করতো। আপনার ভাইপোটি এবিষয়ে অনেককিছুই জানেন। ওকে ইন্টারোগেট করতে হবে। চলুন তো আমার সঙ্গে। " বিক্রম উঠে পড়লো। আমরাও সঙ্গ নিলাম।



বাড়ির পেছনদিকে একটা আউটহাউস জাতীয় ঘর, গাছপালার আড়ালে প্রায় দেখাই যায় না। মোড়াম বিছানো রাস্তায় জায়গায় জায়গায় মাকাল বনকেঁদুরির মতো লতায় ঢেকে গিয়েছে। সর্বত্রই উদাসীনতার ছাপ স্পষ্ট । দরজার কাছে এসে অঘোরবাবু হাঁক দিলেন, "বিশাল ! বিশাল !" কোনও উত্তর এল না। আমরাও অনেক ডাকাডাকি করলাম। কোনও উত্তর নেই। অবশেষে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকা হলো।

বিক্রমের শরীরে বল আছে, এক ধাক্কায় দরজার পাল্লাটা ভেঙ্গে সামনে দিকে উল্টে পড়লো। ঘরে ঢুকেই যা দেখলাম তা বর্ণনা করতেও বুক কাঁপছে। ঘরময় জিনিসপত্র সব লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে, যেন এই এক্ষুনি একটা টর্ন্যাডো ঝড় বয়ে গিয়েছে ঘরের ভেতর।

এগিয়ে গেলাম বেডরুমের দিকে। বিছানার উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন বিশালবাবু। পকেট হতে গ্লাভস বের করতে করতে বিক্রম বলল, "ঘরের কোনকিছুতেই কেউ হাত দেবে না। যা করার আমি করছি।"

দেহটাকে উল্টে দিলো বিক্রম। সারা শরীররে কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। ঘাড়ের রগে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে বললো, "He is no more."

(চলবে )