Saturday, September 28, 2019

মরমিয়া বাউল-পথের অভিযাত্রী অগ্নি বসু // তৈমুর খান

মরমিয়া বাউল-পথের অভিযাত্রী অগ্নি বসু    //  তৈমুর খান


মাত্র ৬৬ বছর বয়সেই চলে গেলেন কবি অগ্নি বসু। তাঁর কবিতাতেই তাঁকে চিনতাম । দীর্ঘ পথের পথিক। বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদও করেছেন অনেক। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও কবিতা লিখেছেন।


উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল : চিঠি নেই কতদিন, নৌকা ভেসেছে জলে, ডাকছো নদী? যাই, মায়াহরিণ(কবিতাসংগ্রহ), পরাগ, তোমার চিঠি, দুচোখে অলীক স্পর্শ প্রভৃতি । অনুবাদ গ্রন্থগুলি হল : রিও কানের কবিতা “এসো, তথাগত", রুমির কবিতার বাংলা ভাষান্তর “রুমি", মৎসুও বাশোর হাইকুর বাংলা ভাষান্তর “কেন ভালো বাশো", এডোয়ার্ড লিয়ারের ছবি, অগ্নি বসুর লিমেরিক “যাচ্ছেতাই" এছাড়া “ভুবন ডাঙা", “তিতির পাখি", “দোঁহা" প্রভৃতি ।


          অগ্নি বসুকে বরাবরই এক উচ্চ আধ্যাত্মিক জগতের কবি বলেই মনে হয়েছে আমার। সুফিদর্শনের সঙ্গে এবং বাউল-মার্গের সাধনতত্ত্বের সঙ্গেও তাঁর চেতনালোকের গভীর সংযোগ উপলব্ধি করেছি। ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখলেও কবিতাকে কখনো দুর্বোধ্য ভারাক্রান্ত বা কৃত্রিম বলে মনে হয়নি। বুদ্ধিমত্তা থেকে তিনি উপলব্ধির অভিঘাতকেই ব্যঞ্জনাবহ করে তুলেছেন। কবিতাগুলির নির্মাণশৈলীও অসাধারণ । প্রতিটি কবিতাতেই একরকম ছন্দোবদ্ধ দোলুনি আছে। পাঠ করতে করতে দুলতে হয়। একান্ত ধ্বনিময় অভিনিবেশ ।


বাস্তব থেকে অতিবাস্তবে স্বয়ংক্রিয় একটা আত্মমগ্ন চলন। সহজ ও সারল্যতার মধ্যে দিয়েই তিনি গূঢ় জগতের ঠিকানা খুঁজেছেন । তাঁর প্রতিটি ইশারা, পথ অনুসন্ধান, উপলব্ধি আমাদের ভাবনায় ও বোধে এক প্রতিক্রিয়া জাগায়। হৃদয়ও নয়, মেধাও নয়, এক ভিন্ন রহস্যলোকের হাতছানি তাঁর কবিতায়। সব সময় তা ভাষায় বা শব্দে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। অথচ মনের ভেতর দারুণ এক আলোড়ন। ছোট ছোট কবিতায় মিত-কথনের নির্মেদ চিত্রলিপিতে ক্রিয়াগুলি নৈর্ব্যক্তিক সম্মোহন ধারণ করেই পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করে। অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে হয় আর বার বার অস্ফুটে উচ্চারিত হয় :

“পথ এসে লুটিয়েছে পায়, 
`আমাকে এভাবে ফেলে যায়!'

অথবা, 

“দুটি ঘুমের মধ্যিখানে 
একটু জেগে থাকা, 
এপথ চলা একা…"

অথবা, 

“দিনান্ত-আকাশে লেখা গান, 
এ আলোক, এতো দেবযান" 

জীবনের এপার ওপার জুড়ে আমাদের তুমুল বিমূঢ়তা, বাঁচা-মরার সন্দিহান পথে আমরা চলেছি সবাই জীবনযাত্রী। তিনি দার্শনিকের মতোই উত্তর খুঁজেছেন। কিন্তু উত্তর কি আছে? 

   না কোনো উত্তর নেই। “সাঁই" চলে গেছে। ব্যক্তি “আমি"টি ভাঙা সাঁকোর মতো। সেখানে জীবন কী করে পার হবে? কবি তখন সেই বাউল হয়েই বলেছেন :

“তোমার কথা 
অনুভবের ঘরে 
দুয়ার এঁটে 
একলা বসত করে…."

   এই একলাই তো জীবনের পরিণতি। আত্মিক নিঃসঙ্গতাই মানুষকে বাউল করে। কবিও বাউল হন। সর্বভূতেই নিজেকে দেখতে পান। তখন বলেন :

“এইভাবে 
ডাক দিলে, সাঁই! 
কী হবে বাঁধন দিয়ে, 
যদি মরে যাই…."

মরণ তো বাঁধন মানে না, তা হলে কেন এই মায়া? এই অসার আলোককে তুচ্ছ করে মরমিয়া আত্মিকপথেই কবির বার বার আত্মনিবেদন ।কবিতা স্বয়ংক্রিয় সেই পথেরই অনুগামী অভিযাত্রীর মন্ত্র হয়ে উঠেছে। মারিয়েন উইলিয়ামসনের কথায় বলা যায় :
“The spiritual journey is the unlearning of fear and the acceptance of love." 

(Marianne Williamson) 
অর্থাৎ আধ্যাত্মিক যাত্রা হ'ল ভয়কে প্রকাশ না করা এবং ভালবাসার স্বীকৃতি। অগ্নি বসু ভয়কে সরিয়ে রেখে ভালবাসারই স্বীকৃতি আদায় করেছেন। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ এই শেষ লেখাটিতেও তিনি তাঁর বন্ধুদের উদ্দেশে বলেছেন :


“This misty morning is like your arrival, a shiver, and surprise. You haven't forgotten me, O Dear, Dear, Dear.." সেই না ভুলে যাবারই আবেদন এবং স্বীকৃতি উল্লেখযোগ্য হয়ে রইল।