Sunday, September 22, 2019

সিংহবাহিনী রহস্য / পর্ব ১   //   সুব্রত মজুমদার

সিংহবাহিনী  রহস্য   /   পর্ব ১   //   সুব্রত মজুমদার




আশ্বিনের শেষ, বাতাসে হিমের পরশ লেগেছে। নদীর ধারে কাশের বনজুড়ে খেলা করছে পাগলা বাতাস। কাশের ফুলগুলো সেই বাতাসে মাথাদুলিয়ে খেলা করছে পেঁজা তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘের সঙ্গে। মেঘেরাও কম যায় না, ভেংচি কেটেই ছুটে পালাচ্ছে। একটা প্যাড়া মাছ জলের উপরে মাথা তুলে মেঘদের  কি যেন বলল, ব্যস অমনি একটা মেঘ  মুখ কালো করে সূর্য্যকে আগলে দাঁড়াল। নেমে এল ছায়া। দূরে গ্রামের দূর্গা মণ্ডপে ঢাক বাজছে 'ঢ্যাং কুড়াকুড় ঢ্যাং কুড়াকুড়' ।

                     আজ পঞ্চমী। অঘোরবাবুর বাড়ির পুজো। অনেক দিন হলো জ্ঞাতিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না অঘোরবাবুর। রিটায়ারমেন্টের পর এই প্রথম গ্রামের বাড়িতে আসা। তবে এই পাণ্ডববর্জিত গ্রামে একা একা মন টিকছে না তার। বিক্রমকে টেলিফোন করে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন অঘোরবাবু। বিক্রম কথা দিয়েছে, পঞ্চমীর দিনই সদলবলে হাজির হবে চন্দ্রপুরে।


অঘোরবাবু বেরিয়ে পড়লেন গ্রামের পথে। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। এই গ্রামের রাস্তা দিয়ে যখন ধান বোঝাই করে গোরুর গাড়ি পেরিয়ে যেত দুলকি চালে তখন অঘোরবাবু আর তার বন্ধুরা সেই গাড়ির পেছনে দুলতে দুলতে যেতেন গ্রামের শেষ পর্যন্ত। শরতের ভোরে শিউলি কুড়ানো, দূর্গা মণ্ডপে বসে বসে পাল মশাইয়ের ঠাকুর গড়া দেখা, আরো কত স্মৃতি মনের মণিককোঠা ভেদ করে মানসচক্ষে ফুটে উঠছে।


গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে লাল মোড়ামের রাস্তা, ঠিক যেন সধবা মেয়ের সিঁদুর দেওয়া সিঁথি । সাত আট  কিলোমিটার দূরে এই রাস্তাটা মিশেছে রেলস্টেশনে। আগেরদিন থেকেই একটা টোপরদেওয়া গোরুর গাড়ি ঠিক করে রেখেছেন অঘোরবাবু, বিক্রমদের আনতে যেতে হবে।


গোরুর গাড়ির পেছনটাতে পা দুলিয়ে বসে পড়লেন অঘোরবাবু। গোটা রাস্তার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে যাবেন তিনি। রেলস্টেশনে পৌঁছেই দেখলেন ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ছোট্ট স্টেশনে বিক্রমদের খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। দেখলেন বিক্রম, সায়ক আর দেবলীনা একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। আগমণি গান। এক ভিখারি একতারা বাজিয়ে গাইছে,


পায়ে পড়ি গিরি যাও তাড়াতাড়ি উমা মুখ হেরি প্রাণ জুড়াই
(আমার ) শরতের শশী না দেখি উদাসী পরান আমার বিদরি যায়।
                তুমি হে অচল নাই চলাচল, ও হিয়া বিকল দেখ না তাই,
(গৌরীর )  অস্থি হল সার চুলে জটার ভার তৈল বিনে উমা মাখিছে ছাই।


                  জামাই পাগল ভাবেতে বিহ্বল, সঙ্গের  সম্বল কিছুই নাই,
                  হয়ে দিগম্বর ষাঁড়ের উপর তাথই তাথই নাচে সদাই।
(আমার )   উমার দুখে গিরি কাঁদে অচলপুরী, আনিতে গৌরী মন কি নাই ?
                 উমাপপদে নত বলয়ে সুব্রত চল মা উমায় আনিগে যাই।


                                                              --দুই--


        দিনকয়েক আগে অঘোরবাবু ফোন করেছিলেন। বয়স্ক মানুষ, অনেকদিন খোঁজখবর পাইনি, একটা চিন্তা ছিলই। তবে এবার আমি নিশ্চিন্ত, অঘোরবাবু বহালতবিয়তে গ্রামের বাড়িতে পুজো কাটাচ্ছেন। ফোনে আমাকে পেয়েই আবদার জুড়লেন, "আগামী দূর্গাপঞ্চমীর দিন তোমাকে আমার গ্রামের বাড়িতে চলে এস, তোমার নিমন্ত্রণ রইল । না, করতে পারবে না। বিক্রম আর দেবলীনাও আসছে।"



অঘোরবাবুর অনুরোধ উপেক্ষা করার সাধ্য আমার নেই। তিন জনে চড়ে বসলাম ট্রেনে। রাতের ট্রেনে আমার আপত্তি থাকলেও দেবলীনার খুব উৎসাহ। সারারাত হইচই করে সকালে যখন স্টেশনে নামলাম তখন সবার অবস্থাই সঙ্গীন। চা খেতে খেতে ফেসবুকটা ব্রাউজ করছি, ঠিক সেসময় বিক্রমের ডাক এল, "এই সায়ক, এদিকে এস। দেখ কি সুন্দর গান গাইছে দেখ। আগমণী গান। উমার বিরহে মা মেনকার কাতরোক্তি।"


গাছতলায় গিয়ে দেখলাম একটা ভিখারী একতারা বাজিয়ে গাইছে। কি সুন্দর গলা ! গান শুনতে শুনতে কখন যে তন্ময় হয়ে গেছি জানি না। ঘোর ভাঙল একটা পরিচিত স্বরে


"আরে সায়ক যে ! রাস্তায় কোনও কষ্ট হয়নি তো ! এই যে বিক্রম,.... দেবলীনা... উহ ! তোমাদিকে পেয়ে যে কি আনন্দ হচ্ছে আমার, - বলে বোঝাতে পারবো না। ও হ্যাঁ, বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে তাড়াতাড়ি চল।"


               স্টেশনের বাইরে গিয়ে অঘোরবাবুর গাড়ি দেখে আমার মাথায় হাত। দেখি টোপর লাগানো একটা বলিবর্দযান। আমার মনের কথা আঁচ করতে পেরে বিক্রম বলল," এই দূষণের যুগে এমন পরিবেশবান্ধব গাড়ি কোথায় পাবে ভাই ? চল আজ গোযানে করেই গমন করি। "


গোরুরগাড়ি চলতে লাগলো। চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ, মনে হচ্ছে যেন পাষানপুরীর কোনো দানবের হাত হতে ছাড়া পেয়ে নিজের বাড়িতে চলেছি । সাদা রঙের দুটো বলিষ্ঠ বলদকে গাড়োয়ানটা কখনো পাচনের বাড়ি মারছে তো কখনো ল্যাজ মুলে দিয়ে বলছে," হ্যাট্ হ্যাট্... হুরুররড়... হট্...".    দেবলীনা আর বিক্রম টোপরের ভেতরে আছে বলে প্রকৃতির এই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য উপভোগ হতে বঞ্চিত হচ্ছে। আমি আর অঘোরবাবু পেছনে পা ঝুলিয়ে বসে আছি।


লাল মোড়াম রাস্তার দু'পাশে গাঢ় সবুজ রঙের ধানের চারাগুলির উপর বাউর বাতাস বয়ে চলেছে। ধানের চারাগুলি সেই বাতাসে দিশেহারা হয়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন কোন উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরী রাস্তার ধারে বসে আছে দয়িতের প্রতিক্ষায়, আর বেউর বাতাস অবিন্যস্ত করে দিচ্ছে তার মেঘবরণ এলোকেশ।

একটা প্রকাণ্ড বাড়ির সামনে এসে গাড়ি পৌঁছল। বাড়িটা দেখেই অঘোরবাবুর বংশপরিচয়ের আন্দাজ করা যায়। বয়সের ভারে জীর্ণ বাড়িখানা তিন তলা। বললাম, "এ তো ব্রিটিশ আমলের বাড়ি অঘোরবাবু। আপনার পূর্বপুরুষেরা খুব এ তল্লাটের জমিদার ছিলেন নিশ্চয়।"


অঘোরবাবু গর্বে বুকটা টানটান করে বললেন, "প্রায় তিনশ বছরের পুরানো ভদ্রাসন এটা। আমার পূর্বপুরুষ শ্রীযুক্ত রাজা বিজয়নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মুতাম উল মুলক মুর্শিদাকুলি খান বাহাদুরের কাছ হতে জমিদারির পাঞ্জা পান। তবে এই ভদ্রাসন  কবে তৈরী  হয়েছে সে নিয়ে মতভেদ আছে। এদিকে এস তোমরা। "



আমরা অঘোরবাবুকে অনুসরণ করলাম । গাড়ির গাড়োয়ান ইতিমধ্যেই আমাদের মালপত্র ঘরের ভেতরে পৌঁছে দিয়েছে, এ দিক থেকে আমরা এখন নির্ঝঞ্ঝাট। সদর দরজা পেরিয়ে উঠোনের মত একটা জায়গায় এলাম। বিশাল কংক্রিটে বাঁধানো উঠোন, উঠোনের একদম সামনে পুবমুখো  বিশাল তিন তলা অট্টালিকা, উত্তরদিকে দক্ষিণমুখী ঠাকুরদালান।


 ঠাকুরদালানের সামনে এসে অঘোরবাবু বললেন, "এই হলো আমাদের সিংহবাহিনী মন্দির। যতদূর জানি মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে প্রতিষ্ঠিত দেবী ইনি। ভাস্কর পণ্ডিতের মৃত্যুর পর মারাঠা সেনা বাংলা ছেড়ে চলে যায়। এসময়ই এই অষ্টধাতুর এই সিংহবাহিনী মূর্তিটি আমাদের পরিবারের হাতে আসে।"